অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের জন্য দেশের আটটি জেলায় নির্মাণ করা হয়েছে আটটি দৃষ্টিনন্দন শান্তিনিবাস। প্রতিটি ভবনে ২৫ জন করে প্রবীণ মানুষের বসবাসের সুব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে এগুলো এখন জনশূন্য। ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রবীণদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, অসহায় এবং অবহেলিত প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য এই শান্তিনিবাসগুলো তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সরকারি শিশু পরিবারগুলো, যাতে প্রবীণদের সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে সেখানকার শিশুদের পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাঁদের পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য মতে, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো এবং নানা জটিলতার কারণে সর্বশেষ খরচ দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটি ৬৯ হাজার টাকায়। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে এই আটটি শান্তিনিবাস আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীর শান্তিনিবাসগুলো শুধু নারীদের জন্য এবং ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ভবনগুলো পুরুষ প্রবীণদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিনিবাস প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর একযোগে আটটি শান্তিনিবাসের ‘আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন’ করা হয়।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত পাঁচতলা ভিত্তির ওপর তিনতলা বিশিষ্ট ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটির আয়তন ১ হাজার ৬২১ বর্গমিটার এবং এতে লিফট, অভ্যর্থনা কক্ষ ও দর্শনার্থী কক্ষের মতো সুবিধা রয়েছে। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও একটিতেও প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা করা যায়নি। বরিশাল শহরের সাগরদী শিশু পরিবারের আঙিনায় নির্মিত ভবনের মেঝে ও সিঁড়ি এখন ধুলার স্তরে ঢাকা। একইভাবে রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া এলাকার শান্তিনিবাসের কক্ষগুলোতে ফিল্মের শুটিং করতে দেখা গেছে এবং ভবনের ভিত্তিফলকে তৎকালীন মন্ত্রীর নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। এই ভবনগুলো পরিচালনার জন্য যে প্রয়োজনীয় জনবল প্রয়োজন, তা আজও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব জানান, গত মাসে জনবল অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য সফল না হওয়ায় বিভিন্ন মহলে হতাশা দেখা দিয়েছে। খুলনা সুজনের সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়, এর সঠিক পরিচালনার সদিচ্ছাও জরুরি। বরিশালের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ সাজেদা জনবলের অভাবে ভবনগুলো পড়ে থাকাকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন।
ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের শান্তিনিবাসে বৃষ্টির পানি জমে আসবাবপত্র নষ্ট হওয়ার চিত্রও দেখা গেছে। একই অবস্থা খুলনা ও সুনামগঞ্জের ভবনগুলোর। নোয়াখালীতে শিশু পরিবারের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অস্থায়ীভাবে কিছু শিশু সেখানে থাকছে। প্রতিটি ভবনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও যথাযথ তদারকির অভাবে আসবাব ও সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই শান্তিনিবাসগুলোকে বসবাসের উপযোগী করা সম্ভব। ভবনের ভেতরে ধুলা জমে নষ্ট হচ্ছে আসবাব, কোথাও কোথাও ভবনের দেয়ালে গজিয়েছে শেওলা।

