আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঢাবি ক্যাম্পাসে গণরুম-গেস্টরুম নিপীড়নের স্মারক ‘আর্তনাদ’ উদ্বোধন

DSF NEWS
DSF NEWS
October 22, 2026 3:20 am
Link Copied!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির অন্ধকার অধ্যায় এবং শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের ভয়াবহতাকে স্মরণে রাখতে ‘আর্তনাদ-নীরব ক্রন্দন’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি চত্বরে এটি উন্মোচন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।

স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধনের দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; এদিন ছিল নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নির্যাতনে নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের শাহাদাতবার্ষিকী। আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম যৌথভাবে এই স্মারকটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনিরসহ বিভিন্ন হল সংসদের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন: আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে লাফ আইয়ারের, শীর্ষস্থান ফিরে পেলেন রশিদ

অনুষ্ঠানে আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘একজন বাবা হিসেবে সন্তান হারানোর কষ্ট কোনোভাবেই ভোলার নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে মত প্রকাশের কারণে আমার ছেলেকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া একজন পিতার জন্য কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম জানান, হলের গণরুম ও গেস্টরুমের অপসংস্কৃতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হতো। এর জেরে অগণিত শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন এবং অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ঝরে পড়েছেন। এসব স্মৃতি ও নিপীড়নের ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে এবং শিক্ষার্থীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ থেকে এই ‘আর্তনাদ’ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মতিঝিলের ঐতিহাসিক বাংলার বাণী ভবন এখন প্রতিমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে

স্মৃতিস্তম্ভটির নকশা করেছেন স্থপতি নাজমুল ও তার দল। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ এবং নামকরণ করেছিলেন এজিএস মহিউদ্দিন খান। পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়ার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার। এছাড়া ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন।

স্থাপত্যটির নকশা ও ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, গেস্টরুমের আবদ্ধ দেয়াল ও সংকীর্ণ পরিসরকে বোঝাতে এটি ত্রিভুজাকার উল্লম্ব স্ল্যাবের মতো আকৃতিতে তৈরি। যে স্থান হওয়ার কথা ছিল আতিথেয়তা ও আশ্রয়ের, সেখানে ভয়ভীতি, জবরদস্তি ও সহিংসতার যে চর্চা চালানো হতো, স্থাপত্যটির মাধ্যমে সেই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। এর কালো ঊর্ধ্বমুখী ভর অন্ধকার এবং বন্ধ দরজার পেছনের রহস্যময় মানসিক চাপের প্রতীক।

এই কালো কাঠামোর নিচ থেকে সাদা রঙের অসংখ্য মানবহাত উঠে আসতে দেখা যায়, যা নিপীড়নের শিকার শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত আকুতি ও মুক্তির প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে। আবার কালো হাতগুলোকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার আড়ালে নির্যাতনের বৈধতা খোঁজা হতো। এছাড়া স্তম্ভের পৃষ্ঠে খোদাই করা হয়েছে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন বাক্য, হুমকি, প্রশ্ন ও কথোপকথন, যা তৎকালীন গেস্টরুমের ভয়ার্ত পরিবেশকে মনে করিয়ে দেয়। স্তম্ভটির গায়ের শিলালিপিতে খোদাই করা হয়েছে, ‘যে কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছিল, স্থাপত্যে আজ সেই কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত।’

নকশাকারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্তম্ভটির কালো থেকে সাদা রঙের তীব্র রূপান্তর নিপীড়নের অন্ধকার থেকে সত্য ও স্মৃতির আলোর দিকে উত্তরণের বার্তাকে বহন করে। যেখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যরাতে ডেকে এনে রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুসরণে ব্যর্থতায় শাস্তি দেওয়া হতো, সেই নির্মম অভিজ্ঞতার বিপরীতে এই স্থাপত্যটি এখন প্রতিবাদ ও স্মরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সাইটে নিজস্ব নিউজ তৈরি করে প্রকাশ করে থাকি। এই সাইটের সংবাদ নিয়ে কোনো অভিযোগ, আপত্তি বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে info@dsfnews.com-এ জানান। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।