নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির রাজনীতির মাঠে এখন বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এক সময়ের গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিত দুই প্রভাবশালী আইনজীবী—সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আনোয়ার প্রধানের মধ্যে এখন প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব চলছে। এই বিরোধের মূলে রয়েছে সমিতির আসন্ন নির্বাচন এবং সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই দুই নেতা পৃথকভাবে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে চলছেন। আইনজীবী সমিতিকেন্দ্রিক (বার) রাজনীতিতে একজনের হাত ধরেই অন্যজনের উত্থান। আলোচিত সাত খুন মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে সাখাওয়াত হোসেন খান দেশজুড়ে পরিচিত। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে তিনি পরাজিত হন।
নির্বাচন ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দুটি প্রধান ইস্যুতে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নিয়োগ এবং অন্যটি আদালত স্থানান্তর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। মূলত এই ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করেই গত মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আইনজীবী লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ঘটনাস্থলে আসতে হয়। বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো পক্ষই থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা দায়ের করেনি। এটি মানতে না পেরে মঙ্গলবারের ঘটনা ঘটিয়েছে।
আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকট: প্রবাসীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে বর্তমান সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবিরসহ আইনজীবীদের একটি বড় অংশ রয়েছে। অন্যদিকে আনোয়ার প্রধানের সঙ্গে রয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর অনুসারী আইনজীবীরা। সাখাওয়াত হোসেন বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে আনোয়ার প্রধান সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি অতীতে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সমর্থনে দুবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন এবং এবার সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেনের ঘনিষ্ঠ আইনজীবীরা এবার সভাপতি পদে জাকির হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন। সাখাওয়াত হোসেন জানান, আনোয়ার প্রধান ইতিপূর্বে দুবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই এবার অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া উচিত। বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তফসিল না হলেও প্রার্থী বাছাইয়ের আলোচনা থেকে এই দূরত্বের সূচনা হয়েছে। তবে নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
আরও পড়ুন: মিরসরাইয়ে ৮ বছরের শিশু মুগ্ধর বিস্ময়কর সাফল্য
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিশেষ পিপি নিয়োগ নিয়েও দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। গত ২৫ আগস্ট সরকার সুমন মিয়াকে ওই ট্রাইব্যুনালে বিশেষ পিপি হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে আইনজীবীদের একটি অংশের বিরোধিতার কারণে তিনি এখনো চেম্বারে বসতে পারছেন না। অভিযোগ রয়েছে, আনোয়ার প্রধান ও পিপি আবুল কালাম আজাদের অনুসারীরা ওই চেম্বারে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। সুমন মিয়া জানান, তিনি দায়িত্ব পালন করতে চাইলেও বাধার মুখে পড়ছেন। তবে আনোয়ার প্রধানের দাবি, সুমন মিয়া সমিতির সদস্য নন, তাই বারের সদস্যদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেওয়া উচিত।
আদালত স্থানান্তর নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও শ্রম আদালতের কার্যক্রম চানমারী এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। আনোয়ার প্রধানের অনুসারীরা আদালত স্থানান্তরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আইনজীবী আওলাদ হোসেন জানান, বিষয়টি আইনজীবীদের জন্য পেশাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর সঙ্গে মামলা পরিচালনা ও মক্কেলের যাতায়াতের মতো বিষয় জড়িত।
আরও পড়ুন: ইরান চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত: পারমাণবিক কর্মসূচিতে পরিবর্তনের আহ্বান
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন খান অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে উদ্দেশ্য করে অশোভন ও অশ্লীল মন্তব্য করা হয়েছে এবং প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না জেনে আনোয়ার প্রধান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। বিপরীতে আনোয়ার প্রধানের অভিযোগ, সাখাওয়াত হোসেন এখন প্রশাসনের চেয়ার পাওয়ার পর তাঁদের আর প্রয়োজন মনে করছেন না। তাঁর অভিযোগ, সাখাওয়াত হোসেন বারের সদস্য নন এমন ব্যক্তিকে পিপি নিয়োগ দিয়েছেন। প্রতিবাদ করলে উল্টো তাঁকে হেনস্তা করা হয়।
পিপি আবুল কালাম আজাদ দাবি করেছেন, সাখাওয়াত হোসেনের অনুসারীদের হামলায় তিনি আহত হয়েছেন। আবার সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, তিনি পেশাজীবনে আনোয়ার প্রধানের শিক্ষক ছিলেন এবং আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুইবার দায়িত্ব পালনকারীদের নতুন করে একই পদে নির্বাচন না করার কথা ছিল। এই শর্ত অমান্য করায় আনোয়ার প্রধানের সঙ্গে এই বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। একসময় একই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ছিলেন তাঁরা।
এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ আইনজীবীরা বিব্রত বোধ করছেন। গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন মন্তব্য করেন, আইনজীবীরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন, তাই নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি বা বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি পুরো আইনজীবী অঙ্গনের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

