যশোরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দিরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই নানা বিতর্ক ও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মন্দির চত্বরে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের চেষ্টা, সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা, আর্থিক অসঙ্গতি এবং নারীঘটিত নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল। সম্প্রতি মন্দির চত্বরের জীর্ণ কুটির থেকে শিপ্রা ঘোষ (১৭) নামের এক কিশোরীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয়দের ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিবেদক চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দির ও আশপাশের এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। মন্দিরে নিয়মিত নারীদের যাতায়াত আছে।
মৃত শিপ্রা ঘোষের পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন নেতা অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসের ক্রমাগত মানসিক হয়রানি, অসদাচরণ ও যৌন নিপীড়নের কারণেই ওই কিশোরী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চলছে এবং যদি তদন্তে কেউ অপরাধী বলে প্রমাণিত হয়, তবে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। মৃত কিশোরীর সহপাঠী, শিক্ষক, পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় হিন্দুদের বড় একটি অংশ এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও অধ্যক্ষের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
এর বিপরীতে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন দাবি করেছেন, মন্দিরের অধ্যক্ষ অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ এবং ইসকনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বেশিরভাগই ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের বক্তব্য অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ইসকনের নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষ করে অপার গোবিন্দ দাসের বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর চেয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশের মধ্যেই ইসকন বিরোধী মনোভাব অত্যন্ত প্রবল। তারা সাধুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি, অর্থ আত্মসাৎ, নারীঘটিত কেলেঙ্কারি এবং ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি সম্পূর্ণ নিজেদের কবজায় নেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর রাতের ঘটনার পর ১৯ সেপ্টেম্বর যশোর জেনারেল হাসপাতালে শিপ্রা ঘোষের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর স্বজন ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মরদেহ নিয়ে যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় তারা মন্দিরের অধ্যক্ষসহ ইসকনপন্থী সাধুদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং তাদের গ্রেপ্তার দাবি করেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অভিযুক্তরা সাধুর পোশাকে থেকে অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজেদের সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবিতে বিদ্যালয়ের সামনে এবং পরে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেয়। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক অমলকৃষ্ণ সরকার জানান, শিপ্রা নিয়মিত ক্লাসে আসত এবং পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী ও শান্ত স্বভাবের ছিল। তার সহপাঠীরাও তার আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অধ্যক্ষ মো. আরিফুজ্জামান, সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক শফিকুল ইসলাম, চায়না খাতুন, সাংস্কৃতিক সংগঠক হারুন অর রশিদ প্রমুখ একই সুরে কথা বলেন।
স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আরও একটি কারণ ছিল শিপ্রার মরদেহ যখন ময়নাতদন্ত শেষে ১৯ সেপ্টেম্বর মন্দির চত্বরে আনা হয়, তখন সেদিন রাধাষ্টমী উপলক্ষে মন্দিরে উৎসব ও উচ্চস্বরে গান-বাজনা চলছিল। কয়েকশ ভক্তের উপস্থিতিতে ওই আনন্দ উৎসব চলতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা লাশের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের প্রতিবাদে পুরোহিত ও আয়োজকদের ওপর চড়াও হলে উৎসব পণ্ড হয়ে যায় এবং ভক্তরা সেখান থেকে চলে যান। পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন পরে সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন এবং উৎসব বন্ধের নির্দেশ দেন। যদিও অপার গোবিন্দ দাসের দাবি, তিনিই পরিস্থিতি বিবেচনায় উৎসব বন্ধ করেছিলেন এবং পরে নিরাপত্তার স্বার্থে সেখান থেকে সরে যান। লাশের পাশে এভাবে উৎসব চলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।
আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মৃত কিশোরীর ভাই পাপন ঘোষ অভিযোগ করেছেন যে, তারা মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস, অর্জুন দাস, পার্থ দাস ও পবিত্রসহ কয়েকজন সুনির্দিষ্ট এবং অজ্ঞাতনামা আরও সাতজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তাদের লিখিত এজাহার তিনবার পরিবর্তন করায়। অভিযোগ রয়েছে, এজাহার থেকে যৌন হয়রানি ও অনৈতিক নিপীড়নের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলো বাদ দিতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে তাৎক্ষণিকভাবে ধর্ষণের মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসকন যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, অপরাধী প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
যশোরের ঐতিহাসিক চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দিরটি এই অঞ্চলের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন ধর্মীয় কেন্দ্র। এটি চাঁচড়ার রাজবংশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একসময় এই মন্দিরে ১৬টি ঐতিহাসিক বিগ্রহ ছিল বলে নথিপত্র থেকে জানা যায়। রাজপরিবারের উত্তরসূরিরা দেশত্যাগের পর স্থানীয় ব্রাহ্মণদের তত্ত্বাবধানে এখানে নিয়মিত পূজা সম্পন্ন হতো। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে এই মন্দিরের ব্যবস্থাপনায় ইসকনের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। জরাজীর্ণ মন্দিরের সংস্কার ও নিয়মিত পূজার মান উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয় সনাতনীরাই প্রথমে ইসকনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দাবি করেন। তবে বর্তমানে স্থানীয় হিন্দুদের অভিযোগ, মন্দিরের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে সাধারণ ভক্ত ও প্রতিবেশীদের প্রবেশ কার্যত বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে ইসকন। বিশেষ উৎসব ছাড়া মূল ফটক বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় এক নারী অভিযোগ করেছেন যে, মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস এর আগেও একাধিক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করেছেন এবং এর প্রতিবাদ করলে স্থানীয় সনাতনীদের মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি কিছু নারীকে কৌশলে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও তুলেছেন অনেকে। এছাড়া মন্দিরের তীব্র শব্দের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে মুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি বিনষ্টের উপক্রম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, নামাজের সময় বা আজানের সময়ও উচ্চ শব্দে খোল-করতাল বাজানোর কারণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এই দ্বন্দ্বের কারণে তিনি নিজে এখন আর ওই মন্দিরে যান না। তবে অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, সনাতনী ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী শুধু মৃদু করতাল ও মৃদঙ্গ বাজানো হয় যা ক্ষতিকর কিছু নয়। সহপাঠীদের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল।
মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী প্রাচীন সনাতনী পরিবারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করার অভিযোগও ইসকন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জোরালো হয়েছে। পূর্বে সেখানে প্রায় ১০টি পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও ইতিমধ্যে লালু শীল, সদা শীল ও শ্যামল সরকার নামের তিন বাসিন্দার পরিবার সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং বিভিন্নভাবে হুমকি ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। উচ্ছেদ হওয়া শ্যামল সরকার জানান, তার গর্ভবতী পুত্রবধূর শারীরিক কারণে সাময়িকভাবে তারা ঘর ভাড়া নিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগে ইসকন কর্তৃপক্ষ তাদের ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়। বর্তমানে বসবাসকারী মৌসুমি ঘোষসহ অন্য বাসিন্দারা তাদের তিন পুরুষের ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
এই সার্বিক জটিল পরিস্থিতি এবং শিপ্রা ঘোষের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তে এগিয়ে এসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটিতে রয়েছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু, প্রেস ক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলাম, সহসভাপতি সরোয়ার হোসেন এবং মানবাধিকারকর্মী তাহমিদ আকাশ। এই কমিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিনের চলমান বিরোধ ও উচ্ছেদের ঘটনা বিস্তারিত তদন্ত করবে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় এখন শুধু শিপ্রার মৃত্যুর বিচারই নয়, বরং এই ঐতিহাসিক মন্দিরটিকে ইসকনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে সাধারণ ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি তুলেছেন। শিপ্রার মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে।

