নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রেমের বিয়ে, দাম্পত্য কলহ, অর্থ দাবির অভিযোগ এবং মৃত্যুর আগে রহস্যজনক শারীরিক অসুস্থতা। এসব ঘটনা ঘিরে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে রাকিবুল ইসলাম ওরফে বিপলুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য অশান্তি, মানসিক চাপ ও অর্থের দাবির মধ্যে ছিলেন রাকিবুল। মৃত্যুর দিনও স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া ও মারামারির ঘটনা ঘটেছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাকিবুল ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়া, তেজগাঁও এলাকার তার পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার স্থায়ী ঠিকানা পটুয়াখালী এলাকায় । অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী সিমু আক্তারের স্থায়ী ঠিকানা বরগুনা সদর এলাকা এবং বর্তমান ঠিকানা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজি নগর।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে দুই পরিবারের অমতে বিয়ে করেন রাকিবুল ও সিমু। পরে উভয় পরিবার তাঁদের বিয়ে মেনে নেয়। রাকিবুলের বাবা মো. মেনাজ মৃধা প্রথম দিকে আপত্তি জানালেও পরে ছেলের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাঁদের গ্রহণ করেন।
তবে বিয়ের পর তাঁদের সংসারে নানা অশান্তি দেখা দেয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। প্রতিবেশী ও বাড়ির ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। তাঁদের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটত বলে অভিযোগ রয়েছে। রাকিবুলকে তাঁর স্ত্রী মারধর করতেন বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।
রাকিবুলের পরিবারের অভিযোগ, দুই পরিবারের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলাকালে সিমুর পরিবারের পক্ষ থেকে অর্থ দাবি করা হয়। একপর্যায়ে রাকিবুলের বাবা ছেলের জন্য জমি কেনার কথা বলে সিমুর মায়ের হাতে পাঁচ লাখ টাকা তুলে দেন।
পরবর্তী সময়ে রাকিবুল নিজের মায়ের কাছ থেকে তার শাশুড়িকে আরও পাঁচ লক্ষ্য টাকা নিয়ে দেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তবে এত টাকা দেওয়ার পরও রাকিবুলের শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে অর্থের দাবি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রাকিবুলের পরিবারের।
পরিবারের দাবি, গত ০৪ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাকিবুলের বড় ভাই মো. নান্নু মিয়ার কাছে জমি কেনার জন্য আরও তিন লাখ টাকা দাবি করেন রাকিবুলের স্ত্রী। নান্নু মিয়া তাৎক্ষণিকভাবে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিরোধ তৈরি হয় বলে পরিবারের ভাষ্য। তাঁদের অভিযোগ, টাকা না দিলে রাকিবুলকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
রাকিবুলের মৃত্যুর দিনের ঘটনা জানতে তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই সাইফুল, সবুজ ও সাইফুলের স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাকিবুল ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে ব্যাপক ঝগড়া ও মারামারি হয় ।রাকিবুল বাসায় যাওয়ার কথা বলাতে ওরা আরও হিংস্র হয়ে যায় এবং রাকিবুলকে বের হতে দেয়নি। এরপর সবাই মিলে রাকিবুলকে মারধর করেন। কিছুক্ষণ পর থেকে একটানা বমি করতে থাকেন। তাঁকে তেঁতুল ও লেবুর রস খাওয়ানোর পর বমি বন্ধ হয় না বলে তাঁরা জানান।
পরে আবার অসুস্থ বোধ করলে রাকিবুলের পরিবারকে খবর দেওয়া হয় এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে তাঁদের বক্তব্য।
তবে একই বাড়ির ভাড়াটিয়া হাসানের বর্ণনায় শেষ সময়ের কিছু ঘটনা ভিন্নভাবে উঠে এসেছে।
হাসানের বর্ণনা অনুযায়ী, হাসান তাদের কক্ষে ঢুকে দেখেন যে রাকিবুল বিছানায় পড়ে আছেন, কিন্তু তার অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না। পরে হাসান রাকিবুলকে পরীক্ষা করে দেখেন যে তার শরীর শক্ত হয়ে গেছে। তখন হাসান বুঝতে পারেন যে রাকিবুল অনেক আগেই মারা গেছেন। হাসান খেয়াল করেন যে রাকিবুলের স্ত্রীর বড় ভাই সাইফুলের হাতে বড় বড় কালো রঙের ট্যাবলেট রয়েছে। পরে হাসান সাইফুলকে জিজ্ঞেস করেন, এগুলো কিসের ট্যাবলেট। সাইফুল বলেন, এগুলো গ্যাসের ট্যাবলেট। কিন্তু হাসানের সন্দেহ হয়। পরে হাসান পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন যে এগুলো বিষাক্ত কিছু।
হাসান ট্যাবলেট দুটি হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর নাকে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। এরপর তিনি দ্রুত রাকিবুলকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে তাঁর দাবি অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার আগে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয়।
পরে রাকিবুলকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তাঁর পরিবারকে খবর দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে ট্যাবলেট দুটি কী ধরনের ছিল, সেগুলোর সঙ্গে রাকিবুলের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তথ্য অনুযায়ী, রাকিবুলকে খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান যে তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন।
পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে মরদেহের সুরতহাল প্রস্তুত করে এবং লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় বলে পরিবার জানিয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে জানাজা শেষে তাকে তার স্থায়ী ঠিকানায় দাফন করা হয়।
রাকিবুলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তাঁর পরিবার থানায় যোগাযোগ করেছে বলে তারা জানিয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু জানানো সম্ভব নয় বলে পুলিশ তাদের জানায়।
এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ০৫ অক্টোবর রাকিবুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।এছাড়াও রাকিবুল ইসলামের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাকিবুলের পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ, কথিত মানসিক নির্যাতন ও অর্থের দাবির কারণে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা, এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে। তাঁরা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: অসহায় শত মায়ের মুখে খাবার জোগাতে জরুরি সহায়তা চায় ‘আপন নিবাস

