মোঃ রমজান আলী কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে হুমায়রা নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হুমায়রাকে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের রডের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে কোটচাঁদপুর পৌরসভার বাদামহাটা পাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে হুমায়রাকে উদ্ধার করে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত হুমায়রা কোটচাঁদপুরের বেনেপাড়া এলাকার বদিউল আলমের মেয়ে। প্রায় পাঁচ বছর আগে পারিবারিকভাবে বাদামহাটপাড়ার সেলিম হায়দারের ছেলে আবু নাঈমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের নুসাইবা (৩) ও নোমান (প্রায় দেড় বছর) নামে দুটি সন্তান রয়েছে।
হুমায়রার পরিবারের দাবি, বিয়ের পর তাদের সংসার মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। তবে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এরপর থেকে হুমায়রার ওপর বিভিন্ন সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের।
ঘটনার পর প্রথমে হুমায়রার পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে তারা দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে মরদেহ দেখার পর তাদের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মরদেহের কিছু বিষয় তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি।
হুমায়রার চাচি সালমা অভিযোগ করেন, মরদেহ দেখার সময় তিনি কানের ওপর আঘাতের মতো একটি চিহ্ন দেখতে পান। তার দাবি, ওই চিহ্নসহ মরদেহের বিভিন্ন বিষয় দেখে তাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
হুমায়রার দুই ভাই আব্দুল্লাহ ও নুরুল্লাহ বলেন, প্রথমে তারা আত্মহত্যার খবর পেয়ে হাসপাতালে যান। পরে মরদেহ দেখে তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাদের অভিযোগ, হুমায়রাকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, হুমায়রার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং পরে দাফন করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে হুমায়রার দুটি শিশু সন্তান রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, বড় সন্তানকে মায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ করেছে। তবে শিশুটির বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, যথার্থতা এবং ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হুমায়রার পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি করেছেন, শ্বশুর সেলিম হায়দার ও শাশুড়ির বক্তব্যেও কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। একই ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়ায় তাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে বলে জানান তারা।
পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রভাব বা অর্থের মাধ্যমে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। তারা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিরপেক্ষভাবে প্রস্তুত করা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
তবে হুমায়রার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। কোটচাঁদপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, অভিযোগ ও অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ অন্যান্য আলামত ও তথ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। হুমায়রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে এখন তদন্তের ফলাফল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।

