মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় দুটি কনটেইনারবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা ওই এলাকায় নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’ এবং অন্যটি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী ‘কেপ ডাও’।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, আগের ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলায় ড্রোনসহ অজ্ঞাত বস্তুর ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত কৌশলের অংশ। সামুদ্রিক নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট এক সূত্র বলেছে, হামলার গতি বেড়েছে এবং তা পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। এর আগের দিন জাহাজটিতে হামলা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: আইএমএফের ২০২৭ ফান্ড ইন্টার্নশিপ
ইরান অবশ্য জিএফএস প্রাইড ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) দাবি, জাহাজটি অবৈধ পথে চলাচলের সময় নৌমাইনের আঘাতে ডুবে যায়। এতে প্রায় আড়াই হাজার কনটেইনার ছিল। তবে ইউকেএমটিওর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উভয় জাহাজেই অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হেনেছিল, যা ইরানের দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাহাজটিতে একটি বস্তু আঘাত হেনেছিল। সম্প্রচারে জাহাজটিকে পানিতে একদিকে কাত হয়ে থাকতে দেখা যায়। জাহাজটিতে ২ হাজার ৫০০টি কনটেইনার ছিল বলেও জানানো হয়।
ফাইনান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দুই সপ্তাহে মোট ২৪টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী তিনটি ও অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি ট্যাংকারও রয়েছে। রোববার এক দিনেই ছয়টি জাহাজ হামলার কবলে পড়েছিল। এই পরিস্থিতির জেরে ওই অঞ্চলে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গেছে।
আরও পড়ুন: শেষ ৭ মিনিটে রিয়ালের অসাধ্য সাধন
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইরান তাদের শক্তি প্রদর্শনের নতুন কৌশল নিয়েছে। তেহরানের উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক তেলের দাম কমিয়ে আনার মার্কিন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়া। ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির বর্তমান প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জাহাজে হামলা চালিয়ে নিজেদের আঘাত হানার সক্ষমতা দেখাতে চাইছে তেহরান। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
আরও পড়ুন: আমার বউ আমার টেনশন না, আপনাদের টেনশন: ওমর সানী
ইরানের অভ্যন্তরীণ উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এই নতুন কৌশলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। দেশটির বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করছে—এমন সন্দেহে বিভিন্ন জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার মাত্রা ও পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন বাহিনী ইরানের অধিকাংশ রাডার সক্ষমতা ধ্বংস করার পর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন মোড় নিয়েছে। মার্কিন এক সামরিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, আইআরজিসি এখন ছোট ছোট নৌকায় নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক মোতায়েন করছে। গত সপ্তাহে এমনই একটি ঘটনায় একটি ঐতিহ্যবাহী নৌযান বা ‘ধৌ’ থেকে ইরানি পর্যবেক্ষকদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান আইআরজিসিকে জানানোর বিষয়টি মার্কিন বাহিনীর নজরে আসে। পরবর্তীতে মার্কিন বাহিনী ওই নৌযানটির মুখোমুখি হলে সেটিকে ধ্বংস করা হয়, যদিও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান বারবার সতর্কবার্তা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলের বিকল্প পথ দিয়ে নিরাপদে পার করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

