রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওলেশকিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। ডিনিপার নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার বেসামরিক মানুষ আটকা পড়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৪০টি শিশু রয়েছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই শহরটি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে এটি যুদ্ধের সম্মুখসারির একটি অঞ্চলে পরিণত হওয়ায় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শহরটিতে এখন প্রায় ২ হাজার বেসামরিক মানুষ রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৪০ জন শিশু।
আরও পড়ুন: ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে হামলায় অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি পাইলট হামাম আল-হামানিকে
শহরটির বাসিন্দারা জানান, সেখানে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ ঘরে জমানো সামান্য শেষ খাবার দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। এক বাসিন্দা তার অভিজ্ঞতায় জানান, বাড়ির আঙিনায় থাকা সামান্য সবজি, আলু, পিঁয়াজ, জুচিনি, টমেটো ও বার্লি দিয়ে শেষবারের মতো বোর্শ রান্না করেছেন। শহরজুড়ে প্রতিনিয়ত ড্রোন ও আগুনের আতঙ্ক বিরাজ করায় স্বাভাবিক জীবন কার্যত থমকে গেছে। খাবার সংকটের তীব্রতায় অনেকে এখন দিনে মাত্র একবার আহার করতে পারছেন। স্থানীয় নির্বাসিত মেয়র তেতিয়ানা হাসানেঙ্কো জানান, আটা, মাংস, তেল, চিনি ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট চলছে। অনেকে টিকে থাকতে বাধ্য হয়ে ভোজ্য আগাছা খাচ্ছেন। বছরের পর বছর শহরের বাসিন্দারা সংরক্ষিত খাবার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফসল এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা খাদ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিলেন। কিছু বাসিন্দা পুরোনো শুকনো পাস্তা, নিজেদের বাড়ির আশপাশে জন্মানো সবজি এবং এমনকি ভোজ্য আগাছা খেয়ে জীবন ধারণ করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে শহরটিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নেই। এছাড়া, যাতায়াতের পথগুলোতে মাইন পাতা এবং নিয়মিত ড্রোন হামলার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। আগে খাদ্যবাহী গাড়ির মাধ্যমে সরবরাহ কিছুটা বজায় থাকলেও, একটি গাড়ি মাইন বিস্ফোরণে ধ্বংস হওয়ার পর সড়কপথে ত্রাণ আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ফলে ஏற்பட்ட বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন এই পরিস্থিতি বাসিন্দাদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ সরানোর মতো পরিস্থিতিও নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের পর ভয়াবহ বন্যায়ও ওলেশকি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধান ধীরাজের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক
এই মানবিক পরিস্থিতির জন্য উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রুশ বাহিনী বাসিন্দাদের শহর ছাড়তে বাধা দিচ্ছে এবং খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টাকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসকে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউক্রেন দাবি করছে, মানবিক সহায়তাগুলো এখন ড্রোনের মাধ্যমে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাঠাতে হচ্ছে। একই বছরের নভেম্বরে ইউক্রেনীয় বাহিনী খেরসন শহর পুনর্দখল করলে রুশ সেনারা নদীর ওপারে ওলেশকিতে অবস্থান শক্তিশালী করে।
অন্যদিকে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই বিপর্যয়ের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, ইউক্রেনীয় বাহিনীই সাধারণ মানুষকে শহর থেকে বের হতে দিচ্ছে না এবং খাদ্য ও পানীয় জল সরবরাহের ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ফলে মানবিক করিডোর স্থাপনের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
স্থলপথে ত্রাণ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন ড্রোনের মাধ্যমেই খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সম্মুখসারির এই শহরে মানবিক করিডোর তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আটকে থাকা বেসামরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অনাহারে থাকা কুকুর কখনো কখনো মরদেহের কাছে চলে যাচ্ছে।

