৩৮২ জনের ধারণক্ষমতার কারাগারে প্রায় সাড়ে ১২ শত বন্দি; আবাসন, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ
স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় চারগুণ বন্দি অবস্থান করছেন। ৩৮২ জন বন্দি রাখার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় সাড়ে ১২ শত বন্দি রয়েছেন। অতিরিক্ত বন্দির চাপে কারাগারের আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কারারক্ষীরাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের নির্ধারিত ধারণক্ষমতা ৩৮২ জন। বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২৫০ জন। ফলে ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৮৫০ জন বেশি বন্দি সেখানে অবস্থান করছেন।
অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের বিভিন্ন কক্ষের পাশাপাশি মালামাল রাখার স্থান ও কক্ষের বাইরের বারান্দাতেও বন্দিদের রাখার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে কারাগারে জায়গার সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
যেসব কারণে বাড়ছে বন্দির চাপ
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, জেলার ছয়টি উপজেলায় মাদক মামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে—৩, ৬ ও ১২ মাস—কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের আপিল ও জামিন না হওয়ায় কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ছে।
এছাড়া বিশেষ অভিযানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের কারণেও ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেড়েছে বলে জানা গেছে।
আবাসন ও স্যানিটেশনে বাড়তি চাপ
কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি থাকায় আবাসিক কক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা, ঘুমানোর ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে টয়লেট, গোসল, পানি সরবরাহসহ অন্যান্য স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
কারাগারে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনযাপনেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বন্দিদের।
বাড়তি দায়িত্বে কারারক্ষীরা
বন্দির সংখ্যা বাড়লেও নির্ধারিত জনবল অনুপাতে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ফলে বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনে কারারক্ষীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগারে বন্দির চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এবং মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হলে কারাগারে বন্দির চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
একই সঙ্গে কারাগারের অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামাল দিতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো এবং বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও বাড়তি চাপ
অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক বন্দির স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কারা কর্তৃপক্ষকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
যা বলছে কারা কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোঃ হাবিবুর রহমান ও জেলার স্বপন কুমার ঘোষ বলেন, “কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩৮২ জন। বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ শত। ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দি বেশি থাকায় ব্যবস্থাপনায় চাপ রয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী বন্দিদের খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।”
তারা আরও বলেন, “বন্দির সংখ্যা বেশি হলেও কারাগারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমাতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্দিদের জন্য মানবিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কারা ব্যবস্থাপনার সার্বিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

