ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার। বুধবার দায়ের করা এই মামলায় বার প্রায় তিন মিলিয়ন শেকেল বা ১০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। রোনেন বারের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে তিনি বারবার সতর্কবার্তা দিলেও নেতানিয়াহু তা উপেক্ষা করেছেন। অথচ এখন নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, হামলার দায় এড়াতেই নেতানিয়াহু তাকে দায়ী করছেন।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতার মধ্যেও রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬ অক্টোবর রাতে হামাসের অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখে শিন বেতের কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় শুরু করেন। পরদিন ভোর ৩টা ৩ মিনিটে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় এবং ৩টা ৫৫ মিনিটে তা নেতানিয়াহুর সামরিক সচিবালয়কে জানানো হয়। তবে ওই রাতে সেনাপ্রধান বা সামরিক গোয়েন্দাপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার বিষয়টি বার অস্বীকার করেছেন। রোনেন বার নিজে স্বীকার করেছেন যে, হামলার সময় ও ব্যাপকতা সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে শিন বেত ব্যর্থ হয়েছিল, যার দায়ভার তিনি গ্রহণ করেছেন। এই ব্যর্থতার জেরে শেষ পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হয়। এরপর সকাল ৬টার কিছু পর রোনেন বারের চিফ অব স্টাফ তার সামরিক সচিবকে বিষয়টি অবহিত করেন। মামলার নথিতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুর দিকে হামাসের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা নিয়েও একাধিক সতর্কবার্তার উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন: শারদীয় দুর্গোৎসব ও ফেলে আসা অসাম্প্রদায়িক শৈশব
বালের দাবি, হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি দীর্ঘ সময় ধরেই প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে আসছিলেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অস্থিতিশীলতা শত্রুদের আরও সাহসী করে তুলবে। এরপর জুলাই মাসে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুকে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকির কথা জানান এবং সতর্ক করেন যে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষে এমন হামলার পূর্বাভাস দেয়া কঠিন হতে পারে। কিন্তু বারের দাবি অনুযায়ী, হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রস্তাব তিনি বারবার দিলেও নেতানিয়াহু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বা সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেছেন। গাজায় ‘যেকোনো মূল্যে শান্ত’ বজায় রাখার নীতিতে অটল ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন: ইসরাইলি কারাগারে দুই বছরে দুই হাজার ফিলিস্তিনি শিশু আটক
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন যে, বার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছিলেন এবং সেনাদের সতর্ক করতে বা নোভা সংগীত উৎসবে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। নেতানিয়াহুর দাবি, জরুরি যোগাযোগের জন্য নির্ধারিত সুরক্ষিত লাইন দিয়ে বার চাইলে তার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। এর বিপরীতে বারের ভাষ্য, নেতানিয়াহু তাকে ব্যক্তিগত ফোন নম্বরই দেননি। এছাড়া নেতানিয়াহু দাবি করেছেন যে, তিনি তার অবস্থানের সপক্ষে প্রায় এক হাজার নথি জমা দিয়েছেন। এছাড়া মানবিক সহায়তার অর্থ হামাসের সামরিক শাখার কাছে পৌঁছানোর আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক করা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু গাজায় কাতারের অর্থ প্রবাহ অব্যাহত রেখেছিলেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর দপ্তর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আস্থার সংকটের কথা উল্লেখ করে ২০২৫ সালের মার্চে নেতানিয়াহু সরকার রোনেন বারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় শিন বেত তদন্ত করছিল যে, নেতানিয়াহুর সহযোগীরা কাতারের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করছেন কি না। যদিও নেতানিয়াহুর দপ্তর সেই অভিযোগও অস্বীকার করে। পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট বারের বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করলে তিনি কয়েক মাস দায়িত্ব পালন করেন এবং অবশেষে জুন মাসে পদত্যাগ করেন। হামাসের ওই হামলায় ১২০০ ইসরাইলি নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়, যার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে ৭৪ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

