নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি: মো. মাসুদ রানা মিশু: ভোরের আলো ফুটতেই মাথায় গামছা বেঁধে জমিতে ছুটে চলেন কৃষক। কেউ ব্যস্ত ধানের চারা রোপণে, কেউবা ফসলের পরিচর্যায়। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কৃষকের নিরলস পরিশ্রমে সবুজ হয়ে উঠেছে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার মাঠঘাট। রোপা আমন ধানের সবুজ সমারোহে মুগ্ধকর হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জনপদ। এই ফসল ঘিরেই কৃষকের স্বপ্ন—ভালো ফলন, পরিবারের সচ্ছলতা আর সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ।
আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কৃষিনির্ভর নিয়ামতপুর উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। চলতি মৌসুমে উপজেলায় রোপা আমন ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৪০ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আবাদ কম হয়েছে ৬০০ হেক্টর।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রোপা আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড ২৫ হেক্টর, উচ্চফলনশীল (উফশি) ৩০ হাজার ১৩০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধান ৮৯০ হেক্টর। সব মিলিয়ে মোট লক্ষ্যমাত্রা ৩১ হাজার ৪০ হেক্টর।
অন্যদিকে, অর্জিত আবাদে হাইব্রিড ধান ৬৫ হেক্টর, উফশি ধান ২৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধান ৮৩০ হেক্টর। তিন জাত মিলিয়ে মোট আবাদ হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪০ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের এই হিসাব অনুযায়ী, হাইব্রিড ধানের আবাদ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ৪০ হেক্টর। তবে উফশি ধানে ৫৮৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধানে ৬০ হেক্টর ঘাটতি রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো সময় মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আমনের ভালো ফলন নিশ্চিত করতে সময়মতো চারা রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ, জমির যথাযথ পরিচর্যা, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ের তদারকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়ামতপুরের কৃষকদের কাছে আমন ধান শুধু একটি ফসল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সারা বছরের সংসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ভালো ফলন হলে কৃষকের মুখে হাসি ফোটে, সংসারে স্বস্তি ফিরে আসে। অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা তাঁদের দুশ্চিন্তায় ফেলে।
গ্রামীণ জনপদের কর্মব্যস্ততা, মাঠের সবুজ আর কৃষকের জীবনসংগ্রাম সবকিছু মিলিয়ে নিয়ামতপুরের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কৃষকের শ্রমে উৎপাদিত ফসল শুধু পরিবারের চাহিদা পূরণ করে না, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখে।
তাই কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা, সময়মতো প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়ামতপুরের মাঠে বেড়ে ওঠা ধানের প্রতিটি শিষ যেন কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে এমন প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষিজীবী মানুষের।
আরও পড়ুন: রাকিবুলের রহস্যজনক মৃত্যু: পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যা

