মৌলভীবাজারে আধুনিক গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু ভালো ফলনের পরও লাভের মুখ দেখতে না পারায় স্থানীয় চাষিদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও লোকসানের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সার, কীটনাশকসহ উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেলেও বাজারে টমেটোর দাম গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। মূলত ভারত থেকে টমেটো ও কাঁচামরিচ আমদানির প্রভাবে স্থানীয় বাজারে দরপতন ঘটেছে বলে দাবি করেছেন তারা। এর বিপরীতে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি টমেটো চাষ হয়। এখানকার উৎপাদিত টমেটো ও গ্রাফটিং চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১,২০০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমের টমেটো চাষ হয়েছে। এছাড়া খরিপ-১ মৌসুমে ১৩০ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন ১৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। জেলায় এ বছর ৬৫ লাখেরও বেশি গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদিত হয়েছে, যার প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কমলগঞ্জের আদমপুর, মাধবপুর ও ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই পদ্ধতির চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তরুণ উদ্যোক্তা আব্দুল মান্নানের তথ্যমতে, শুধু কমলগঞ্জ উপজেলাতেই গ্রাফটিং টমেটো চাষ ও চারা উৎপাদন কেন্দ্র করে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৩ বিঘা জমিতে প্রায় ২৬ লাখ টাকা খরচ করে চাষাবাদ করা আব্দুল মান্নান জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লেও গত বছর ১০০-১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া টমেটো এবার মাত্র ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও সরকারি স্বল্প সুদে ঋণের অভাব কৃষকদের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
চাষিদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো জেলায় টমেটো সংরক্ষণের জন্য হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা। ধলাই ও গোপলা নদীর ভাঙনে ক্ষেতের ক্ষয়ক্ষতি এবং গাছের রোগবালাই নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা সরকারি প্রণোদনা পাচ্ছেন না তারা। এছাড়া নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহার করেও রোগ দমন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অনেক কৃষক দাবি করেছেন। চা-শ্রমিকরা এই মৌসুমে টমেটো ক্ষেতে শ্রম দিয়ে সংসার চালালেও, মালিক পর্যায়ের চাষিরা এখন আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের অভিযোগ, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মিলছে না। এতে উৎপাদনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা।কমলগঞ্জে ক্লাস্টারভিত্তিক চাষ ও মালচিং পেপার ব্যবহার করে আগাম টমেটো উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। কৃষকদের ভাষ্য, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে এসে টমেটো ক্ষেত বা গ্রাফটিং চারার খোঁজ-খবর নেন না, প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন না।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত কৃষকরা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ চারা উৎপাদন করেছেন। তিত বেগুনের সঙ্গে গ্রাফটিংয়ের ফলে গাছের স্থায়িত্ব ও ফলন দুই-ই বাড়ে। কৃষকদের প্রণোদনা দিতে বর্তমানে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার তালুকদার জানান, এ পর্যন্ত ৩৮০ জন কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং নদীর বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ পদ্ধতি জেলার অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন জানান, হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে আলোচনা চলছে। তিনি আরও বলেন, পাতা কুঁকড়ে যাওয়া ও পাতা মরা রোগ রোধে আক্রান্ত গাছ দ্রুত অপসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। কৃষকরা বলছেন, সঠিক বাজারমূল্য ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া গেলে এই গুরুত্বপূর্ণ কৃষি খাতটি জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।

