পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক বাসিন্দাকে আটকে রেখে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে করা এক রিট পিটিশনের শুনানি চলাকালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। ৯ অক্টোবর, শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, আদালত মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো সুযোগই দেয়নি। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সন্দেহের বশে কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর কোনো আইনি ক্ষমতা রাজ্য সরকারের নেই। এ বিষয়ে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, ‘সুতরাং, যেকোনো ব্যক্তিকে দেশান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচিত তার নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই করা। রাজ্য সরকারের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার যুক্তি দেন যে, আটক ব্যক্তি হয়তো জাল বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ডের মতো নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণগুলো এমন এক সময়ে এলো, যখন ভোটার তালিকায় নাম, নাগরিকত্ব এবং নথিপত্র সংক্রান্ত বিষয়গুলো জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: খুলনায় ছিনতাইকারীদের কোপে এসআই আহত, উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায়
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৮ আগস্ট থেকে প্রতিবেশীদের দেওয়া কিছু জবানবন্দির ভিত্তিতে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহের তৈরি হয় এবং তাকে আটক রাখা হয়। ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) পক্ষ থেকে আটক ওই ব্যক্তি ও তার স্ত্রীকে দেশান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। স্বামীর আটকের আদেশ ও এই দেশান্তরের নির্দেশের বিরুদ্ধে স্ত্রী আদালতে রিট আবেদন করলে বিচারক দেশছাড়া করার প্রক্রিয়াটি আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। শুনানির সময় বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ও পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ প্রদান করা অত্যাবশ্যক। প্রতিবেদনে বলা হয়, আবেদনকারীর আইনজীবীর দাবি, ‘গত ৮ আগস্ট থেকে কয়েকজন প্রতিবেশীর দেওয়া জবানবন্দি থেকে তৈরি হওয়া সন্দেহের ভিত্তি’তেই তার মক্কেলকে আটকে রাখা হয়েছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার কয়েকদিন পরই নতুন সরকার ‘ডিটেইন, ডিলিট, ডিপোর্ট’ (আটক, বাতিল ও বিতাড়ন) নীতি ঘোষণা করে।
আরও পড়ুন: প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর হাঁটতে শুরু করেছেন ক্রিস্টা
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম আদালতে অভিযোগ করেন যে, তার মক্কেল দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে অন্যায়ভাবে আটক রয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের সঠিক আইনি প্রক্রিয়া বা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে নাগরিককে এভাবে আটক রাখা আইনসম্মত নয়। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বিচারপতি প্রশ্ন রাখেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে কত লোক সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মামলাটি তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে ফেরত পাঠিয়ে একটি উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানোর অনুরোধ করেন। বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, কেবল এ ধরনের তথ্যের ওপর ভর করে কীভাবে একজন মানুষের জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিজেপিশাসিত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, সেখানকার প্রশাসন বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করছে। কোনো ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের আদেশ ছাড়াই বিএসএফের সহায়তায় তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী, সন্দেহভাজনদের হোল্ডিং সেন্টারে আটকে রেখে সংক্ষিপ্ত ও তড়িঘড়ি প্রক্রিয়ায় দেশত্যাগে বাধ্য করা হতো। এমন পরিস্থিতির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, চারজন ভারতীয় নাগরিক—যার মধ্যে এক নারী ও দুটি শিশু ছিল—বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রায় এক বছর কাটিয়ে গত জুলাই মাসে আদালতের নির্দেশেই মহদিপুর স্থলবন্দর দিয়ে নিজ দেশে ফিরে আসেন।

