আজকের সর্বশেষ সবখবর

ব্যস্ততা ও সাফল্যের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের আন্তরিকতা

DSF NEWS
DSF NEWS
October 22, 2026 3:17 am
Link Copied!

অব্যাহত ব্যস্ততা, সাফল্যের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার নিরন্তর চাপে মানুষের মধ্যকার সহজাত আন্তরিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বার্গেন কাউন্টিতে দীর্ঘ সময় বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে এমন এক আত্মিক সংকটের কথা তুলে ধরেছেন লেখক ডানিয়া দামরাহ। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আধুনিক জীবনের এই যান্ত্রিকতায় মানুষ চারপাশ থেকে ভিড়ে ঘেরা থাকলেও ভেতরে ভেতরে এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘মুসলিমম্যাটার্স’-এ ১০ অক্টোবর প্রকাশিত ‘হোয়েন আ প্লেস টিচেস ইউ হোয়াট সফটনেস ইজ নট’ শীর্ষক নিবন্ধে লেখক জীবনযাত্রার প্রভাব মানুষের মন ও ধর্মীয় অনুভূতির ওপর কীভাবে পড়ছে, তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে ফুটে উঠেছে মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ আন্তরিকতার অভাব এবং এমন একটি সম্প্রদায়ের আকাঙ্ক্ষা, যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতা আড়াল না করেই প্রশান্তি খুঁজে পাবে। মসজিদে পাশাপাশি দাঁড়িয়েও দূরত্ব ঘুচছে না, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতরেও অনেকে অনুভব করছেন নিঃসঙ্গতা।

আরও পড়ুন: আবুধাবি টেস্টে লিটন দাসের অনন্য বিশ্ব রেকর্ড

নিউ জার্সির ওই অঞ্চলে জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরে একধরনের নীরব কঠোরতা বিদ্যমান। সাফল্যের পেছনে ছোটাই যেখানে মুখ্য, সেখানে সামাজিক অবস্থানের চাপ মানুষকে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রাখে। এই অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক ও সাফল্যমণ্ডিত মনে হলেও, ব্যক্তিস্তরে অনেকেই ক্লান্তি আর একাকিত্বে ভুগছেন। অথচ এত কিছুর মধ্যেও অনেকেই মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জীবনযাপনের ব্যয়বহুল বাস্তবতা, অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করার প্রবণতা এবং সফল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চাপ মানুষের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। ঈমান কি মানুষকে আরো কোমল করে তুলছে।

মানুষ এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার প্রয়োজনে নিজের চারপাশে মানসিক দেয়াল তৈরি করছে। সেখানে হৃদয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পেশাগত দক্ষতা, আর অনুভূতির বদলে প্রাধান্য পাচ্ছে সামাজিকভাবে নিজেকে ‘সফল’ প্রমাণের অভিনয়। লেখক মনে করেন, কেবল মুসলিম সম্প্রদায় নয়, বরং বৃহত্তর সমাজই এখন এই মানবিক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে মানুষ জীবনের গভীর অর্থ ও প্রকৃত প্রশান্তি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে পাড়া-মহল্লায় মাইকিং ও খুতবায় সচেতনতার নির্দেশ

মসজিদ বা ধর্মীয় উপাসনালয় নিয়েও লেখকের এক হতাশাজনক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। মসজিদ হওয়ার কথা ছিল বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন প্রশান্তির জায়গা, অথচ সেখানেও এখন দুনিয়াবি প্রতিযোগিতার ছায়া পড়ছে। মানুষ ইবাদতের জন্য সমবেত হলেও, শারীরিক উপস্থিতির আড়ালে তাদের মন পড়ে থাকছে পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা ক্যারিয়ারের দুশ্চিন্তায়। এই পরিবেশের কারণে অনেক সময় ইবাদত হৃদয়ের কোমলতা সৃষ্টির পরিবর্তে কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের একটি রুটিনে পরিণত হচ্ছে। ফলে মসজিদ কখনো কখনো আত্মিক প্রশান্তির স্থানের বদলে বাইরের ব্যস্ত জীবনে ফিরে যাওয়ার আগে সাময়িক বিরতি নেওয়ার জায়গায় পরিণত হয়।

এই বিচ্ছিন্নতাবোধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো মানুষের ভিড়ে থেকেও একা থাকা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বা বড় সামাজিক আয়োজনে মানুষের অভাব না থাকলেও, তাদের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্কের গভীরতা নেই। কথোপকথনগুলো চাকরি, স্কুল বা অর্জনের মতো গৎবাঁধা বিষয়ে সীমাবদ্ধ। ফলে কেউ নিজের ভয়, সংশয় বা মানসিক ক্লান্তি নিয়ে কথা বলার মতো নির্ভরযোগ্য কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি যান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর ফল, যেখানে একে অপরকে সময় বা আবেগ দেওয়ার অবকাশ কমে গেছে। মানুষ নামাজে দাঁড়াচ্ছেন, পরস্পরকে সালাম দিচ্ছেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন; কিন্তু এসবের মধ্যেও আন্তরিক যোগাযোগের অভাব অনুভূত হতে পারে। বড় সমাবেশ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ব্যস্ত সামাজিক জীবন কিংবা পরিপূর্ণ কর্মসূচি—এসবের কোনোটিই প্রকৃত সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয় না।

লেখকের মতে, একটি আদর্শ মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিত্তি হওয়া উচিত দয়া ও সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতা নয়। সেখানে মানুষকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে না। বরং ক্লান্ত মানুষগুলো সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে। এমন সমাজে মানুষের কথা বলার মূল বিষয়বস্তু হবে একে অন্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং দুঃখ-কষ্টের ভাগাভাগি। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে গড়ে তোলা সমাজে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করাটা লজ্জার নয়, বরং একতার অংশ হওয়া উচিত।

ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য শুধু নিয়ম পালন নয়, বরং ঈমানের মাধ্যমে হৃদয়ের কোমলতা অর্জন। যদি সামাজিক চাপ মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও অন্যের অনুভূতির প্রতি উদাসীন করে তোলে, তবে সেই ধারার পরিবর্তন জরুরি। লেখক গুরুত্বারোপ করেছেন এমন এক পরিবেশের ওপর, যেখানে কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার খোঁজ নেওয়া হবে এবং বিপদের সময় বিচার না করে পাশে দাঁড়ানো হবে।

পরিশেষে, প্রকৃত আপন জায়গা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ঠিকানা বা এলাকার বাসিন্দা হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটি একটি আত্মার অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজেকে গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ মনে করে। বার্গেন কাউন্টি হয়তো লেখকের জন্য সেই কাঙ্ক্ষিত আশ্রয় হয়ে ওঠেনি, কিন্তু এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে যে, বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে মানবিক সম্পর্ক ও আত্মিক প্রশান্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের একাকিত্বকে শাস্তি হিসেবে না দেখে বরং তা নিজের বিশ্বাস ও অনুভূতির সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আমাদের ফেইজবুক পেইজ

আমাদের টেলিগ্রাম

এই সাইটে নিজস্ব নিউজ তৈরি করে প্রকাশ করে থাকি। এই সাইটের সংবাদ নিয়ে কোনো অভিযোগ, আপত্তি বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে info@dsfnews.com-এ জানান। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।