আজকের সর্বশেষ সবখবর

শারদীয় দুর্গোৎসব ও ফেলে আসা অসাম্প্রদায়িক শৈশব

DSF NEWS
DSF NEWS
October 22, 2026 3:16 am
Link Copied!

আমার জীবনের শৈশব, বাল্যকাল ও যৌবনের একটি বড় সময় অতিবাহিত হয়েছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা ছিল অত্যন্ত গভীর। হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষ সেখানে মিলেমিশে এক নিবিড় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। আমাদের সেই লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল শারদীয় দুর্গোৎসব। আজকের যান্ত্রিকতার ভিড়ে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এক ধরণের নস্টালজিয়া কাজ করে, যা আমাদের শেকড়ের সন্ধানে টেনে নিয়ে যায়। মাল্লার পশ্চিমে টাহরদিয়া গ্রাম পুরোটাই মুসলিম অধ্যুষিত। দক্ষিণে বিল পেরিয়ে পারাবর্তা ও হর্দি গ্রাম; সেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করতেন। পূর্ব দিকে কেটুন গ্রাম সম্পূর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত। আর মাল্লা গ্রামে আমাদের বাড়ির পাশে ছিল মাত্র চারটি মুসলিম পরিবার। আমাদের গ্রামের উত্তরে এগোলেই মঠবাড়ি হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বসতি।

আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ইসরাইলের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানের

আমাদের সেই জনপদে ধর্মের চেয়ে মানুষের পরিচয়ই ছিল বড়। সেখানে ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত একটি ক্যাথলিক গির্জা রয়েছে, যা ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গির্জার উপস্থিতিও আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির এক নীরব সাক্ষী। গির্জার ঘণ্টা ধ্বনি কিংবা মন্দিরের শঙ্খধ্বনি—সবই যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত আমাদের প্রতিদিনের জীবনে। কোনো ধর্মীয় উৎসবের সময় একে অপরের বাড়িতে যাওয়া ছিল খুব স্বাভাবিক বিষয়। দুর্গা পূজার মণ্ডপে গিয়ে আনন্দ করা কিংবা ঈদের সময় বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়ন করা—এভাবেই গড়ে উঠেছিল আমাদের অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ। ছোটবেলায় পূজা, ঈদ কিংবা বড়দিন কোনো উৎসবই যেন কোনো একটি সম্প্রদায়ের একার ছিল না; সব উৎসবই ছিল আমাদের সবার। আমাদের ‘মাল্লা’ গ্রামটি এবং তার চতুর্দিকের সীমাহীন চৌহদ্দি ছিল যেন সম্প্রীতির এক টুকরো শ্যামল মানচিত্র।

আরও পড়ুন: ইস্তাম্বুলে বন্যা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কিশোরের মৃত্যু

ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কথা বলতে গেলে মনে পড়ে পূজার সময়কার সেই উৎসবমুখর পরিবেশের কথা। ঢাকের আওয়াজ আর কাঁসর ঘণ্টার শব্দে পুরো এলাকা মুখর থাকতো। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন আর নতুন পোশাকের ঝিলিক ছিল এক অদ্ভুত আনন্দের উৎস। কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই মানুষ একে অপরের সঙ্গে শারদীয় আনন্দ ভাগ করে নিত। সেই অকৃত্রিম সম্পর্ক ও হৃদ্যতা আজ কিছুটা ফিকে হয়ে এলেও, স্মৃতির পাতায় তা আজও অম্লান।

আমাদের সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে অপরের ধর্মকে শ্রদ্ধা করার যে শিক্ষা আমরা সেই সময়ে পেয়েছি, তা আজও আমার ব্যক্তিজীবনের দর্শনের ভিত্তি হয়ে আছে। আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের অতীতের সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ দিনগুলোর প্রয়োজনীয়তা যেন আরও বেশি করে অনুভব করি।

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ওই ক্যাথলিক গির্জা এবং আশেপাশের জনপদের সেই সহাবস্থান আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। আমাদের সেই শৈশবের দিনগুলো হারিয়ে গেলেও, অসাম্প্রদায়িকতার সেই চেতনা আমাদের পথ চলার পাথেয় হয়ে থাকবে। ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে ভালোবাসার যে শিক্ষা সেই সময় থেকে আমরা পেয়েছিলাম, বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সেই মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়া একান্ত জরুরি। উৎসব কেবল আনন্দের জন্য নয়, বরং তা মানুষের হৃদয়ের মিলনমেলা হিসেবেই টিকে থাকুক শতাব্দীকাল ধরে।

আমাদের ফেইজবুক পেইজ

আমাদের টেলিগ্রাম

এই সাইটে নিজস্ব নিউজ তৈরি করে প্রকাশ করে থাকি। এই সাইটের সংবাদ নিয়ে কোনো অভিযোগ, আপত্তি বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে info@dsfnews.com-এ জানান। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।