দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ থেকে সরে এসে অর্থনীতি, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে মনোযোগী হতে চেয়েছিল সৌদি আরব। তবে ইয়েমেনের নতুন সংঘাত দেশটির এই মহাপরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রিয়াদের বিভিন্ন শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো এখন সরাসরি হুমকির মুখে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইয়েমেন থেকে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই পরিকল্পনার জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। আবুধাবির অধীনে দীর্ঘদিন লড়াই করা হাজারো যোদ্ধাও সৌদির নতুন কৌশলের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি। অন্যদিকে হুতিদের হাতে এখন এমন উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।
প্রায় ১১ বছর ধরে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে আসছে সৌদি আরব। যদিও শুরুতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে রিয়াদ শান্তি আলোচনায় বসার পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর এই গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র রূপ নিয়েছে। গত মাসে এই সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে যায়। পাল্টা জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।
আরও পড়ুন: গজারিয়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের মান নিয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভ
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ধারাবাহিক কিছু কৌশলগত ভুল বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিলতর করেছে। গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে রিয়াদের দীর্ঘদিনের জোটে ফাটল ধরে। এছাড়া, সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সৌদি আরবের মূল্যায়নে বড় ধরনের বিচ্যুতি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
ইয়েমেনে থাকা আমিরাতি সামরিক যানবহরে সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলার ঘটনার পর দুই দেশের প্রায় এক দশকের পুরোনো সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর ফলে আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, যা সৌদি আরবের সামরিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তার মতে, আমিরাতি সেনারা চলে যাওয়ার সময় দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। তাদের দক্ষ কমান্ড ব্যবস্থার বিকল্প রিয়াদ আজও গড়ে তুলতে পারেনি।
আরও পড়ুন: গুলশানের দুই বারে অভিযান: শতাধিক নারী আটক, পরে মুচলেকা
এর প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় এবং লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে নৌ অবরোধ আরোপ করে। বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এখন হুতিদের দখলে, যা ২০২২ সালের পর ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে স্বীকৃত। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি জানান, হুতিদের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলার জন্য সৌদি আরব পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আশ্রয়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করাকেও সৌদি আরবের অন্যতম কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে এবং রিয়াদ ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা পেয়েছে, তবুও বাস্তবে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে রিয়াদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার ফোনে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণের অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প এতে জড়াতে অস্বীকার করেন।
আরও পড়ুন: উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় হামলা
পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব এখন নতুন করে অন্য দেশগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ফ্রান্স সামরিক কর্মী ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছেন।
গত সোমবার রিয়াদের এক জরুরি বৈঠকের পর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সম্মত হয়েছে। এদিকে, ইউএই-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিবিরোধী অভিযানে যোগ দেওয়ায় দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসির মতে, জোটের কমান্ড সেন্টারগুলো একীভূত না করা এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে না পারলে এ ধরনের সামরিক সাফল্য টেকসই হবে না। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গেও যথাযথ সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল।
বর্তমানে সৌদি আরবে হুতি হামলায় ২ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪ বাংলাদেশি নাগরিক আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া এই পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৩ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি ঢাকায় আটকে পড়েছেন। সামরিক শক্তির প্রদর্শনী কিংবা অন্য দেশের সাহায্য দিয়ে ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের ছায়া এই সংঘাতের ওপর সরাসরি পড়ছে।

