সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। গত শনিবারের এ হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত তিন কর্মকর্তা। হামলার ঘটনার পর সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটির সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সৌদির বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ, বাংলাদেশ বিমানের রিয়াদগামী দুটি ফ্লাইট স্থগিত।
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেবে বিএনপি
এ হামলার দায় স্বীকার করেছেন হুতিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। তিনি দাবি করেন, ইয়েমেনে সৌদি জোটের ধারাবাহিক বিমান হামলার জবাবেই তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। আল-বুখাইতির ভাষায়, ইয়েমেনের বেসামরিক স্থাপনা, বাজার, হাসপাতাল এবং শোকসভায় সৌদি বাহিনীর হামলা বন্ধের বার্তা দিতেই হুতিরা এ পথ বেছে নিয়েছে। তাদের মতে, ইয়েমেনের অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের অবকাঠামোকেও একই ঝুঁকিতে থাকতে হবে। সীমান্তের ওপারে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমা হামলা চালাচ্ছে সৌদি যুদ্ধবিমান। আল-বুখাইতি বলেন, হুতিরা এই হামলা চালিয়েছে ‘যেন বিশ্ব বুঝতে পারে ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিয়ের অনুষ্ঠান ও শোকসভার হল, হাসপাতাল এবং বাজার বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো বা ক্ষতি করা উচিত নয়। ইয়েমেনের এসব স্থাপনার ক্ষেত্রে যে নিয়ম প্রযোজ্য, বিশ্বের অন্য কোথাও একই ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে।’।
চলতি সপ্তাহে রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আভার বিমানবন্দরে একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো অঞ্চলে সংঘাত নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। উপসাগরীয় কোনো আরব দেশে এটিই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের রিয়াদকে বিশ্ব ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, এসব হামলা সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে আবারও হামলা, উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আরও পড়ুন: ভোলায় দেশীয় অস্ত্রসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটার বিষয়েও তারা সতর্কবার্তা জারি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হামলার বিষয়টি তারা অবহিত হয়েছেন এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
আরও পড়ুন: গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর: অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ও অব্যাহত সংঘাত
হামলার পর থেকে রিয়াদের বিমানবন্দরের দিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ যাতায়াতের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে সৌদিয়ার কয়েকটি ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। যদিও রিয়াদে আজ রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের জ্বালানি কংগ্রেস যথাসময়ে আয়োজনের কথা জানিয়েছেন আয়োজকরা। বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের সেখানে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর একজন প্রতিবেদক বিমানবন্দরের দিকে অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স যেতে দেখেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও গত জুলাই মাস থেকে উত্তেজনা নতুন করে দানা বাঁধে। গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছে। এদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ হুতিদের উৎখাত করতে নতুন করে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে, যা অঞ্চলটিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের রাজনৈতিক সমাধান এখন অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

