মোঃ শামীম হোসেন – খুলনা: সারা দেশের যুবসমাজের ন্যায় খুলনার দাকোপে মাদক ও অনলাইন জুয়ার কালো থাবায় নিঃশেষ তরুণ সমাজ। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের যুবসমাজের মাঝে লক্ষ্য করা যাচ্ছে এই মাদক ও অনলাইন জুয়া খেলার ভয়াবহতা। একদিকে মাদক যেমন ধ্বংস করছে যুবসমাজকে অন্যদিকে অনলাইন জুয়া নিঃশেষ করছে যুবসমাজকে। মোবাইল এ্যাপস এর মাধ্যমে চলছে জুয়া খেলা। দিন – রাত সমান তালে চলছে এই জুয়া খেলা। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী ও সকল পেশার মানুষের মাঝে এটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। এলাকা ঘুরে দেখা যায় মাদক আর অনলাইন জুয়ার ছোবলে পরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। পুলিশ প্রশাসন মাঝে মধ্যে দুই একজনকে আটক করলেও তাতে থামছে না মাদক ও জুয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মাঠে, ঘাটে এমনকি পড়ার টেবিলেও চলছে অনলাইন জুয়ার আসর। এটি এখন দেশের হাজারো তরুণ-তরুণীর অলক্ষিত জীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। অনলাইন জুয়া বা ‘ই-গেমিং বেটিং’ এখন আর দূরবর্তী কোনো ক্যাসিনোর বিষয় নয়, এটি সরাসরি ঢুকে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের পড়ার টেবিলে, পকেটের ভেতরে। প্রথাগত জুয়ার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার মূল পার্থক্য হলো এর মনস্তাত্ত্বিক অ্যালগরিদম। ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরিই করা হয়েছে এমনভাবে, যেন মানুষের মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করা যায়। শুরুতে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে ছোট ছোট ‘জয়’ উপহার দেয়, যাতে তার মনে বিশ্বাস জন্মে যে সে বিজয়ী হতে পারে। এরপর যখন হারতে শুরু করে, তখন ‘ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার’ (Loss Chasing) এক অদম্য মানসিক তাড়না তৈরি হয়। মানুষ তখন যুক্তিবোধ হারিয়ে কেবল একটি চাল বা একটি ক্লিকের ওপর ভরসা করে সব ঢেলে দেয়। এই অবৈধ ব্যবসার পেছনের অর্থনীতি আরও ভয়াবহ। ডিজিটাল লেনদেনের বিভিন্ন মাধ্যম, অবৈধ এজেন্ট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির আড়ালে প্রতিনিয়ত দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এর বিপণন কৌশল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার, ছোট ছোট কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং খেলাধুলার ছদ্মবেশী স্পন্সরশিপের মাধ্যমে তরুণদের মস্তিষ্কে এটি ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরনের ‘আধুনিক বিনিয়োগ’ বা ‘বিনোদনের’ মোড়কে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি থাকলেও অনলাইন ক্যাসিনো বা বেটিং সাইটগুলোর গতিবিধি অত্যন্ত ধূর্ত। একটি ডোমেইন বা অ্যাপ বন্ধ হলে রাতারাতি মিরর সাইট বা নতুন অ্যাপ খুলে ফেলা হয়। ফলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্দায় ভেসে থাকা কৃত্রিম আলো যখন নিভে যায়, তখন অন্ধকার ঘরে জেগে থাকে কেবল বাস্তবতার নিষ্ঠুর সত্য। উত্তি বয়সের তরুণদের মতো সম্ভাবনাময় তরুণদের জীবন অ্যালগরিদমের এই নীল আলোয় নিঃশেষ হওয়ার আগেই সামাজিক সচেতনতা, কঠোর প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ এবং পারিাবরিক মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, এক ডিজিটাল মোহের আড়ালে হারিয়ে যাবে একটি পুরো প্রজন্মের নীরব মেধা ও ভবিষ্যৎ।

