কিশোর শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে একটি সুন্দর ও ইতিবাচক ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে সংবাদপত্রের শিরোনামে কিশোরের সঙ্গে প্রায়ই ‘গ্যাং’ শব্দটি যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে, যাদের একটি বড় অংশই মেধাবী ও সৃজনশীল। অথচ একটি সুন্দর ও ইতিবাচক শব্দের সঙ্গে নেতিবাচক শব্দ যুক্ত হওয়ার এই প্রবণতা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়েরই প্রতিচ্ছবি। দুঃখের বিষয়, কিশোর কথাটার সঙ্গে গ্যাং কথাটাও উচ্চারিত হচ্ছে।
আমরা যারা নাগরিক সুবিধায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে জেন-জি বা জেন-আলফা কেবল শহরে সীমাবদ্ধ নয়। কুড়িগ্রামের চরে গরু চড়ানো কিশোরা, রংপুরের মাদ্রাসাগামী কিশোরী, পাহাড়-নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া রাঙামাটির শিক্ষার্থী কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মজীবী কিশোর—সবাই আমাদের এই প্রজন্মের অংশ। তাদের জন্য আমরা একটি নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে পারিনি, আবার ভালো মানুষ হওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ বা লক্ষ্যও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা যাঁরা ঢাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দেশের ভাবনা ভাবি, তাঁদের কাছে জেন–জি মানে আধুনিক সচ্ছল একটা প্রজন্ম। কিন্তু কুড়িগ্রামের চরে যে কিশোর স্কুলে যাচ্ছে, কিংবা গরু চরাচ্ছে, রংপুরে যে কিশোরী মাদ্রাসায় যাচ্ছে, রাঙামাটিতে যে কিশোরেরা পাহাড়–নদী ডিঙিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, যে কিশোরেরা গ্লাস ফ্যাক্টরিতে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, যারা টেম্পোর পেছনে ঝুলছে, যারা জুতার দোকানে।
আমাদের শৈশবে খেলাঘর, কচি-কাঁচার মেলা, চাঁদের হাট বা মুকুল ফৌজের মতো সংগঠনের যে বিস্তৃতি ছিল, তা এখন অনেক কমে এসেছে। আগে স্কুলগুলোতে লাইব্রেরি থেকে বই ধার নেওয়া, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নাটক, বিজ্ঞান মেলা বা দেয়ালপত্রিকা প্রকাশের যে চর্চা ছিল, তা কিশোরদের চিন্তার জগতকে বড় করতে সাহায্য করত। অথচ এখন আমরা সচ্ছল হয়েছি, অট্টালিকা বেড়েছে, কিন্তু কিশোরদের মধ্যে অপরাধমনস্কতা ও মাদকাসক্তির মতো সমস্যাগুলো উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ১৩ বছর আগে কিশোরদের মনের আকাশ বড় করার লক্ষ্য নিয়ে পথচলা শুরু করে ‘কিশোর আলো’। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের বই পড়ার আনন্দে অভ্যস্ত করা এবং ভালো মানুষ হওয়ার গুরুত্ব বোঝানো। পত্রিকাটি আজ ১৩ বছর পূর্ণ করল এবং আজ থেকে এর ১৪তম বছরের যাত্রা শুরু হচ্ছে। যদিও ৩ কোটি ৩০ লাখ কিশোরের বিপরীতে এই আয়োজন হয়তো খুবই ছোট্ট, তবু আমরা আশাবাদী। সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকা শত শত স্টারফিশের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটিকে পানিতে ফিরিয়ে দিলেও যেমন তাদের জীবন রক্ষা পায়, আমরাও ঠিক সেভাবে প্রতিটি কিশোরের জীবনে ইতিবাচক আলো ছড়ানোর চেষ্টা করছি। আমাদের কালে আমরা স্কুলের বইয়ে গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’ নামের কবিতা পড়তাম, ‘আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি নিখিল বন–নন্দনে,/ ওষ্ঠে রাঙা হাসির রেখা জীবন জাগে স্পন্দনে।
১৩ বছর আগে যারা কিশোর আলো পড়তে শুরু করেছিল, তাদের অনেকেই এখন কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কেউ কেউ সন্তানের অভিভাবক হয়েছেন। তারা এখন নীতিবান, দেশপ্রেমিক ও স্বপ্নবাজ মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করছে। এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ নিউইয়র্কে কর্মরত সারণী, যিনি কিশোর আলোর স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। তার মতে, কিশোর আলোর সাথে সম্পৃক্ততা ও ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার সোশ্যাল অ্যাংজাইটি কাটাতে এবং নেতৃত্বদানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করেছে। পদার্থবিজ্ঞানী এম জাহিদ হাসানও ছোটবেলায় বিজ্ঞান সাময়িকী পড়ার মাধ্যমেই নিজেকে বিজ্ঞানের জগতে গড়ে তুলেছিলেন। বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের শুরুতে কবিতাটা গান হিসেবে কতবার যে শুনেছি।
কিশোর আলোর এই পথচলায় আমরা কৃতজ্ঞ। শিশু-কিশোরদের হাতে নিয়মিত পত্রিকা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘কিশোর আলো ডট কম’-এর মাধ্যমে কুইজ, প্রতিযোগিতা ও নানা আয়োজনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই। আমাদের বিশ্বাস, বই ও সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত থাকলে কিশোররা বড় মনের মানুষ হয়ে উঠবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সক্ষম হবে।

