তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ সংকট এবং বাড়তি দামের চক্রে নাজেহাল সাধারণ ভোক্তা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি অক্টোবরের জন্য ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অথচ গত মাসে একই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ৪ অক্টোবর এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে তারা।
বাজারে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণ খুঁজতে গিয়ে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে বিইআরসিকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ৬ অক্টোবর পাঠানো এই চিঠিতে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অসম্ভব। সমিতির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি সিলিন্ডার পরিবেশকের কাছে পৌঁছানো থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত নানা স্তরে খরচ ও মুনাফা মিলিয়ে অন্তত ১৫০ টাকা ঘাটতি থাকছে। তাদের দাবি, গত পাঁচ বছর ধরে তারা যে ৫০ টাকা কমিশন পেয়ে আসছেন, তা এখন সময়ের তুলনায় নগণ্য। প্রতি মাসেই দাম সমন্বয় করে সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়, বিআইআরসি দাম নির্ধারণের দিন সন্ধ্যা থেকে এলপিজি কোম্পানিগুলো নতুন মূল্যতালিকা দিয়েছে। সিলিন্ডার ট্রাকে ওঠানো-নামানো ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে খরচ ৩৫ টাকা। প্রতি সিলিন্ডারে ৪০ টাকা মুনাফা চায় তারা।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ, লক্ষ্য জয়
ব্যবসায়ীদের এই দাবির প্রেক্ষিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কমিশন চিঠিটি হাতে পেয়েছে। তবে গণশুনানি ছাড়া দাম বা কমিশন পুনর্নির্ধারণের সুযোগ নেই। আগামী রোববার কমিশন সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সরকার নির্ধারিত দাম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। এদিকে, এলপিজি আমদানি ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘লোয়াব’ জানিয়েছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ১ লাখ ৫৮ হাজার ও ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। ফলে আমদানির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও সরবরাহ পর্যায়ে ঘাটতি কাটতে সময় লাগতে পারে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাজারে মেঘনা ফ্রেশ, ওমেরা, আইগ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স ও বিএম কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কিছুটা সচল থাকলেও অনেক পরিবেশক চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না। আবার কিছু কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ না করেই ১ হাজার ৯৬০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যতালিকা প্রকাশ করছে। এর প্রভাবে মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা তামান্না আখতারের মতো সাধারণ গ্রাহকরা বাধ্য হয়ে চড়া দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। রান্নার পাশাপাশি শিল্প ও পরিবহনেও এলপিজির চাহিদা ব্যাপক। ফিলিং স্টেশনগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন এলপিজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির মহাসচিব হাসিন পারভেজ। তিনি জানান, মাসে ৩০ টন চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ টন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশজুড়ে নিয়মিত তদারকি চালাচ্ছে। অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ২৪২টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৪৭৮টি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় এনে মোট ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে জরিমানা ও অভিযানের মুখেও ব্যবসায়ীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দাবিপূরণ না হলে তারা এলপিজি বিক্রি বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তে যেতে পারেন। দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহকের রান্নার ৮০ শতাংশই এলপিজি নির্ভর হওয়ায় এই অস্থিতিশীলতা জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আর কর্মচারী, গোডাউন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে ২৫ টাকা লাগছে।

