ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সমাজের রূপান্তরের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে শিক্ষা এবং রাজনীতির জটিল সমীকরণ সামনে চলে আসে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার ১৯৪৩ সালে তার গ্রন্থ প্রকাশ করেন। কাকতালীয়ভাবে, সেই একই বছরে বাংলা এক ভয়াবহ ও নির্মম দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। এই দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। তৎকালীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ সরকার ও তাদের ভারত প্রশাসনের উদাসীনতাই এই ব্যাপক প্রাণহানির জন্য প্রধানত দায়ী ছিল। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ১৬। আবার, যদুনাথ সরকার যে বছর তার গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, ১৯৪৩ সাল, ঠিক সে বছরেই গোটা বাংলা আরেকটি নির্মম দুর্ভিক্ষের শিকার হয়, এবং কয়েক লক্ষ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। এই বেদনাদায়ক প্রাণহানির জন্যও বাংলার জনগণের জীবন-জীবিকার প্রতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ সরকার ও তার ভারত প্রশাসনের নির্বিকারত্ব দায়ী। স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৪৩ সালে তা ব্যাপক বিধ্বংসী দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মানি ও ইতালির মিত্রশক্তি জাপান মিয়ানমার দখল করে নেয়। জাপান যাতে বাংলা হয়ে ভারতে প্রবেশ করতে না পারে, তা ঠেকাতে ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার একটি ‘ডিনায়াল স্কিম’ বা কৌশল গ্রহণ করে। এই কৌশলের আওতায় বাংলার কৃষকদের উদ্বৃত্ত চাল সংগ্রহের নামে সরকার ব্যাপক লুটপাট চালায়। এমনকি ১৯৪২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই অভিযানের সময় কৃষকদের নৌযানগুলোও বাজেয়াপ্ত করা হয়, যা ছিল পণ্য চলাচলের প্রধান মাধ্যম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী জার্মানি ও ইতালির মিত্র জাপান ভারতের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার দখল করার পর, বাংলা হয়ে ভারতে প্রবেশ করার সম্ভাবনাকে রোধ করার জন্য, ১৯৪২ সালের মার্চে ব্রিটিশ সরকার জাপানের ব্যাপারে একটি ‘ডিনায়াল স্কিম’ গ্রহণ করে— ‘অগ্রসরমাণ’। কিন্তু এই পরিকল্পনার অধীনে, এপ্রিলেই বাংলায় উৎপাদিত ‘উদ্বৃত্ত চাল’ ক্রয় করার নামে, সরকার সারা বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে ‘উদ্বৃত্ত মজুত চাল’ সংগ্রহ অভিযান শুরু করে এবং পরের মাসে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য চলাচলের জন্য ব্যবহৃত ছোট-বড় হাজার হাজার নৌযান। 126. থেকে ১০ লাখ টন চাল কিনে ভারতে পাঠানোর জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের (১৮৮৬-১৯৫৭) সরকারকে অনুরোধ জানালে, চার্চিলের মন্ত্রিসভা, বিশেষ করে চার্চিলের উপদেষ্টা ও ‘পে-মাস্টার জেনারেল’, লর্ড শেরওয়েল (১৮৮৬-১৯৫৭), বাংলার খাদ্য সমস্যার গভীরতাকে।
প্রাদেশিক কিষান সভার তথ্যানুযায়ী, এই দুর্ভিক্ষের ফলে সারা বাংলায় প্রায় এক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ অনাহার ও অপুষ্টিজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে এবং ৬৫ লক্ষ মানুষ ভূমিহীন ও গৃহহীন হয়ে পড়ে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা লর্ড ওয়াভেলের মতে, এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনাধীন কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। তবে ব্রিটিশ সাংবাদিক লিওনার্ড মোসলি মনে করেন, এই বিপর্যয় কোনো প্রাকৃতিক কারণ থেকে আসেনি, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফসল ছিল। বাংলার ‘প্রাদেশিক কিষান সভার’ হিসাব অনুযায়ী, “দুর্ভিক্ষের কারণে সারা বাংলায় প্রায় এক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লক্ষ অনাহার ও অপুষ্টিজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে, আর অবশিষ্ট ৬৫ লক্ষ মানুষ সারা জীবনের জন্য গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে বাংলার ৯০ হাজার। 35, 65, 90, 127, 1883, 1950.
ইতিহাসবিদ জেমস মিলের বিশ্লেষণে মুসলিম শাসকদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংস্কৃতির প্রশংসা পাওয়া যায়। তিনি গজনির মাহমুদকে এশিয়ার অন্যতম সংস্কৃতিবান রাজন্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মিলের মতে, মুঘল শাসকরা বহিরাগত হলেও তারা ভারতকে আপন দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পারস্যের শিল্পকলা ও আইনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। হিন্দু শাসনের তুলনায় মুসলিম শাসনে করব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো অধিকতর উন্নত ও বৈষম্যহীন ছিল বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
তবে জেমস মিলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। ব্রিটিশ আইনের উৎকৃষ্টতা প্রমাণের প্রয়াসে তিনি ১৭৭২ সালের ‘রেগুলেটিভ অ্যাক্ট’-এর সংস্কার কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি ভারতীয় শাসনের তুলনামূলক বিচারে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুঃশাসন ও অর্থনৈতিক শোষণের ফলে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তার প্রকৃত কারণ লুকিয়ে রেখে তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নেন।
উল্লেখ্য যে, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৯২১ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ১৯২৪ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট এবং ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি জগন্নাথ হলের মাঠে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের অপরাধে হরেশ ভট্টাচার্য ও অতীন্দ্র কুমার নামে দুজন শিক্ষার্থীকে ব্রিটিশ প্রশাসন তৎকালীন সময়ে দণ্ডিত করেছিল। এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ঔপনিবেশিক শাসন ও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার এক উজ্জ্বল সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে।

