যুক্তরাষ্ট্রে শরতের আগমনের সাথে সাথে বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোতে দুর্গাপূজার প্রস্তুতির ধুম পড়ে গেছে। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে নিউজার্সি, বস্টন, শিকাগো, আটলান্টা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এবারের দুর্গোৎসবের আয়োজনে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। ২০২৬ সালে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি অঞ্চলে পূজার আয়োজনের ব্যাপ্তি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে দুই ডজনের বেশি দুর্গাপূজা আয়োজিত হচ্ছে। ফলে অক্টোবরজুড়ে নিউইয়র্ক-নিউজার্সির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলো কার্যত একেকটি ছোট বাংলায় পরিণত হচ্ছে। টাইমস স্কয়ারের আয়োজনটির একটি বিশেষ দিক হলো—এটি প্রচলিত বাঙালি কমিউনিটি হলের বাইরে নিউইয়র্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান জনপরিসরে দুর্গাপূজাকে নিয়ে এসেছে। প্রতিদিন বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের সামনে দেবী দুর্গার আরাধনা, বাংলা সংগীত, নৃত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নিউইয়র্কে দীর্ঘ ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজার ইতিহাস খুব পুরোনো নয়, কিন্তু এর শিকড় বেশ গভীরে। তখন নিউইয়র্কে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকশ।
নিউইয়র্কের ফাদার ডাফি স্কয়ারে আয়োজিত উৎসবে পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি এবং প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের গীতাপাঠ ও ধুনুচি নাচের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকছে। আয়োজকদের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ১০ অক্টোবর মহালয়া হওয়ায় টাইমস স্কয়ারের আয়োজনে এক বিশেষ তাৎপর্য যুক্ত হয়েছে, যদিও মহালয়া ও মূল পূজার সময়সূচির ভিন্নতার কারণে আয়োজকেরা টাইমস স্কয়ারে ১০ ও ১১ অক্টোবরকে বিশেষ উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বাংলা খাবার, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ, মেলা ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এসব পূজা। আয়োজকদের প্রকাশিত সূচিতে ১০ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজা থেকে শুরু করে সপ্তমী ও অষ্টমীর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার কথা রয়েছে।
প্রবাসী বাঙালিদের ইতিহাসে নিউইয়র্কে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছিল ১৯৭০ সালে। সেই ছোট পরিসরের যাত্রা আজ টাইমস স্কয়ারের মতো আন্তর্জাতিক জনপরিসরে এসে ঠেকেছে, যা প্রবাসী বাঙালি সমাজের বিবর্তনেরই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। ইস্ট কোস্ট দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাদের আয়োজনে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি ভক্ত অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ পূজা সমিতি অব নিউইয়র্ক ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে পূজা উদযাপন করে আসছে; ২০২৬ সালে তারা তাদের ৩৭তম দুর্গোৎসব পালন করছে, যা ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
নিউজার্সিতেও উদযাপনের আমেজ তুঙ্গে। জার্সি সিটির গার্ডেন স্টেট পূজা কমিটি এবার ৪৫তম দুর্গোৎসব উদযাপন করছে। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর উইলিয়াম এল.-এ এই আয়োজন সম্পন্ন হবে। এছাড়া অন্যান্য অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, রিদম কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পূজা ২৩ ও ২৪ অক্টোবর ফার্মার্স ব্রাঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে। সোইকটের ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত হবে। বাঙালি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যারিজোনার আয়োজন চলবে ২৩ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত।
মূলত ধর্মীয় উৎসব থেকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীকে রূপান্তরিত দুর্গাপূজা ২০২১ সালে ইউনেস্কোর মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০২৬ সালের এই ব্যাপক আয়োজন এটিই প্রমাণ করে যে, দুর্গাপূজা এখন আর শুধু নিউইয়র্ক, নিউজার্সি বা বোস্টনের মতো ঐতিহ্যবাহী বাঙালি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সারা আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে এক প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। কোথাও কয়েক দশকের পুরোনো সংগঠনের ঐতিহ্যবাহী পূজা, কোথাও আবার নতুন প্রজন্মের উদ্যোগে গড়ে উঠছে নতুন আয়োজন।

