বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা আইনের নতুন সংশোধনী খসড়া নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা চলছে। খসড়ায় অনলাইনে গালিগালাজ, অপমান, মানহানি, গুজব, অযাচাইকৃত তথ্য, মিম শেয়ার এবং সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনার মতো বিষয়ে শাস্তির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং লাখ টাকার জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
এর মানে হলো ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট, শেয়ার বা কমেন্টও আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। মনে রাখতে হবে, এটি এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে। চূড়ান্ত আইনে কী থাকবে বা কী বাদ যাবে, তা পরে নির্ধারিত হবে।
তবু খসড়ায় প্রস্তাবিত বিষয়গুলো সহজভাবে জেনে রাখা দরকার।
১. অনলাইনে কাউকে গালি বা অপমান করলে ঝুঁকি
ফেসবুক বা অন্য প্ল্যাটফর্মে কাউকে গালি, অপমান বা হেয়প্রতিপন্ন করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। নারী বা শিশুর ক্ষেত্রে শাস্তি দ্বিগুণ হতে পারে—সর্বোচ্চ ১০ বছর জেল বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা।
২. মিম শেয়ার করলেও বিপদ থাকতে পারে
মিম আপনি নিজে না বানিয়ে শুধু শেয়ার করলেও অপরাধে সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হাহা রিঅ্যাকশনের মতো বিষয়ও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
৩. AI দিয়ে ছবি বিকৃত করে মজা করলে ঝুঁকি
রাজনৈতিক ব্যক্তি বা অন্য কারও ছবি AI দিয়ে বিকৃত, অশ্লীল বা আপত্তিকর করে বানালে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ব্যঙ্গ, কার্টুন বা প্যারোডির জন্য আলাদা স্পষ্ট ছাড় নেই বলে সমালোচনা রয়েছে।
৪. খবর যাচাই না করে পোস্ট করলে বিপদ
কোনো খবর সত্য কি না নিশ্চিত না হয়ে পোস্ট করলে পরে গুজব বা মিথ্যা তথ্য হিসেবে ধরা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর জেল বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার ঝুঁকি থাকতে পারে।
৫. ভুয়া খবরের স্ক্রিনশট দিয়ে খণ্ডন করলেও প্রশ্ন উঠতে পারে
ভুয়া খবরের স্ক্রিনশট নিয়ে “এটা ভুয়া” বলে পোস্ট করলেও সেটিকে ওই খবর প্রচারের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকতে পারে। তাই সতর্কতা জরুরি।
৬. সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট ব্লক হতে পারে
সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা যদি রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বা ক্ষতিকর মনে করা হয়, তাহলে কনটেন্ট ব্লক বা সরানোর সুযোগ থাকতে পারে।
৭. প্রতিষ্ঠানের খারাপ রিভিউ দিলেও ঝামেলা
হাসপাতাল, কোম্পানি বা রেস্টুরেন্টের সেবা নিয়ে “ঠকায়” বা “প্রতারণা করে” জাতীয় মন্তব্য মানহানির অভিযোগে আসতে পারে। অনলাইন রিভিউ দেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।
৮. সাংবাদিকরাও পুরোপুরি নিরাপদ নন
সূত্রের বরাতে তথ্য প্রকাশ করলে পরে সেটি অযাচাইকৃত বা ভুল হিসেবে বিবেচিত হলে আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। খসড়ায় সাংবাদিকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আলাদা সুরক্ষা নেই বলে সমালোচনা আছে।
৯. একই পোস্টে একাধিক মামলার আশঙ্কা
মামলা করার পরিধি আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। ফলে একই পোস্ট নিয়ে একাধিক জায়গা থেকে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
১০. কিছু ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার
কিছু অপরাধ আমলযোগ্য হলে পুলিশ আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে বলে খসড়ার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে।
১১. পোস্ট ডিলিট করলেই মামলা শেষ হয় না
ভুল বুঝে পোস্ট মুছে ফেলা বা ক্ষমা চাওয়ায় মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে না। আদালতের সম্মতি লাগতে পারে।
১২. কিছু অপরাধ মোবাইল কোর্টেও বিচারযোগ্য
সব মামলা সাইবার ট্রাইব্যুনালে যাবে না। কিছু অপরাধ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্টেও বিচার হতে পারে।
১৩. ভুল ব্লক বা গ্রেপ্তারে কর্মকর্তার দায় নিয়ে প্রশ্ন
কনটেন্ট ভুলভাবে ব্লক বা কাউকে ভুলভাবে গ্রেপ্তার করা হলে কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির সুযোগ থাকতে পারে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদেরক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও পরিষ্কার নয়।
১৪. শাস্তির মাত্রা নিয়ে বড় প্রশ্ন
অযাচাইকৃত খবর বা গুজবের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের শাস্তির প্রস্তাব সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সমালোচকরাসমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, গুরুতর সাইবার অপরাধের সমান বা তার চেয়ে বেশি শাস্তি শুধু অযাচাইকৃত তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে কতটা যৌক্তিক।
মোটের ওপর, এটি এখনো চূড়ান্ত আইন নয়। আলোচনার পর অনেক কিছু পরিবর্তন হতে পারে। তবে খসড়ার প্রস্তাবগুলো দেখে স্পষ্ট যে সামাজিকসামাজিক মাধ্যমে পোস্ট, শেয়ার বা কমেন্ট করার আগে এখন থেকে বেশি সতর্ক থাকাই নিরাপদ।

