মোঃ শামীম হোসেন – খুলনা: চলতি ভরা মৌসুমেও খুলনার দাকোপের পশুর, শিবসা, ঢাকীসহ উপকূলীয় নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত রূপালী ইলিশের দেখা মিলছে না। দিনরাত নদীতে জাল ফেলেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের। ফলে স্থানীয় বাজারে ইলিশ যেন এখন সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই স্মৃতি। একদিকে চড়া দামে ইলিশ কেনা ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে, অন্যদিকে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় চরম ঋণের বোঝা ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন উপজেলার হাজারো জেলে পরিবার। উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পৃথক তিনটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দাকোপের চারপাশ নদী দিয়ে বেষ্টিত। এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল মৎস্য শিকার। উপজেলার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঢাকী, ভদ্রা, শিবসা, কাজীবাছা, মাঙ্গা, পশুর ও ঝপঝপিয়া নদী একসময় ইলিশের প্রধান অভয়ারণ্য ছিল। বর্তমানে এসব নদীর ওপর প্রায় কয়েক হাজার জেলে পরিবার প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। সরেজমিনে পশুর ও শিবসা নদীর তীরবর্তী এলাকায় গিয়ে জানা যায়, অনেক জেলে এনজিও’র চড়া সুদের ঋণ কিংবা মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে জাল ও নৌকা মেরামত করে নদীতে নেমেছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় তাদের খরচের টাকাও উঠছে না। বানিশান্তা এলাকার প্রবীণ জেলে রমেন্দ্রনাথ মন্ডল আক্ষেপ করে বলেন, এবছর ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করে নৌকা ও জাল তৈরি করেছি। ৪ জন লোক নিয়ে ১২ দিন নদীতে নেমেছি, কিন্তু ডিজেলের খরচই উঠছে না। সংসার চালাবো নাকি ঋণের কিস্তি দেবো, মাথায় কাজ করছে না। বাজুয়া এলাকার ৪০ বছরের অভিজ্ঞ জেলে ভবেন মন্ডলও একই কথা জানান, এমন আকাল তিনি আগে কখনো দেখেননি। নদীতে ইলিশের আকালের প্রভাব সরাসরি পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোতে। চালনা বাজারের নিয়মিত ক্রেতা জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, ভরা মৌসুমে আশা ছিল ইলিশের দাম কিছুটা কমবে এবং সাধ্যের মধ্যে আসবে। কিন্তু বাজারে দু-একটি ছোট ইলিশ চোখে পড়লেও তার কেজি প্রতি দাম হাঁকা হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। সাধারণ মধ্যবিত্তের পক্ষে এই দামে ইলিশ কিনে খাওয়া অসম্ভব। নদী থেকে ইলিশ উদাও হওয়ায় বাজার এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো: আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এ বছর আষাঢ় মাস প্রায় শেষ হলেও স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়নি। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় নদ-নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ কমেছে এবং অনেক নদীর নাব্যতা ও গভীরতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ এবং প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। এ ছাড়া নদীতে পানির প্রবাহ কম থাকায় সাগর থেকে ইলিশের উজানে অভিবাসনও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইলিশের উৎপাদন অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, যেমন আবহাওয়া, নদীর পানিপ্রবাহ, লবণাক্ততার পরিবর্তন, খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রজনন মৌসুমের পরিবেশ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, যদি মৌসুমের বাকি সময়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হয় এবং নদীতে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ ফিরে না আসে, তাহলে এ বছর ইলিশের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে।
আরও পড়ুন: লন্ডনে ওয়াটফোর্ড বাংলাদেশী অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের মেজবান অনুষ্ঠিত

