ট্যাঙ্কার যুদ্ধ (Tanker War) ছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র অংশ। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধে দুই দেশই একে অপরের তেলবাহী জাহাজ (ট্যাঙ্কার) ও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। এটি বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আক্রমণের ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
যুদ্ধের শুরু ও কারণ
- ১৯৮০: ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিকে স্থলযুদ্ধে আটকে পড়ে।
- ১৯৮১-১৯৮৪: ইরাক প্রথমে ইরানের তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করা, কারণ ইরানের তেল রপ্তানি ছিল তার যুদ্ধের প্রধান অর্থের উৎস।
- ১৯৮৪: ইরাক আক্রমণের মাত্রা বাড়ায় এবং ফ্রান্স থেকে পাওয়া Super-Etendard বিমান ও Exocet মিসাইল ব্যবহার করে। ইরানও প্রতিশোধ নিতে শুরু করে।
- ফলে যুদ্ধ সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালী হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্র।
যুদ্ধের পর্যায়সমূহ
- প্রথম পর্যায় (১৯৮১-১৯৮৪): ইরাক প্রধানত ইরানের খার্গ দ্বীপ (Kharg Island) এবং ইরানি তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ করে। ইরান তখনও বড় আকারে প্রতিশোধ নেয়নি।
- দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৮৪-১৯৮৭): ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ইরাকের মিত্র কুয়েত, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে। ইরান মাইন পেতে, স্পিডবোট ও মিসাইল ব্যবহার করে।
- তৃতীয় পর্যায় (১৯৮৭-১৯৮৮): যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। অপারেশন আর্নেস্ট উইল (Operation Earnest Will) চালু করে কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলোকে আমেরিকান পতাকা দিয়ে সুরক্ষা দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
- ১৯৮৭: ইরানি মাইনের আঘাতে USS Bridgeton ক্ষতিগ্রস্ত হয় (প্রথম আমেরিকান কনভয়ে)।
- ১৯৮৭: ইরাকি বিমান ভুল করে USS Stark ফ্রিগেটে আঘাত করে, ৩৭ জন আমেরিকান নাবিক নিহত হয়।
- ১৯৮৮: ইরানি মাইনের আঘাতে USS Samuel B. Roberts ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস (Operation Praying Mantis) চালিয়ে ইরানের দুটি তেল প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করে।
- ১৯৮৮: USS Vincennes ভুল করে ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ (বেসামরিক বিমান) গুলি করে ভূপাতিত করে, ২৯০ জন নিহত হয়। এটি যুদ্ধ শেষের অন্যতম কারণ হয়।
- মোট আক্রমণ: ইরাক ২৮৩টি, ইরান ১৬৮টি। ৪০০+ নাবিক নিহত, শতাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
- অপারেশন আর্নেস্ট উইল: কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলোকে আমেরিকান পতাকা দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া হয়। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কনভয় অপারেশন ছিল।
- যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল প্ল্যাটফর্ম ও জাহাজ ধ্বংস করে।
পরিণতি
- যুদ্ধ ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শেষ হয়।
- হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়, তেলের দাম বেড়ে যায়।
- এই যুদ্ধ আজকের হরমুজ সংকটের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। বর্তমান ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধে অনেকে এর পুনরাবৃত্তি দেখছেন।
হরমুজ প্রণালী শুধু তেলের পথ নয় — এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাঙ্কার যুদ্ধ তার প্রমাণ।
এই সাইটে নিজস্ব নিউজ তৈরি করে প্রকাশ করে থাকি। এই সাইটের সংবাদ নিয়ে কোনো অভিযোগ, আপত্তি বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে info@dsfnews.com-এ জানান। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

