সিলেট মহানগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা নগরবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মাদক সেবন, ছিনতাই, চুরি, মারামারি, নারীদের উত্ত্যক্ত করা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর অন্তত ১৫টি স্থানে এসব গ্যাংয়ের সক্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) সম্প্রতি নগরজুড়ে বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে। নির্বাচনের আগে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত নগরী গড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এসব এলাকায় দলবদ্ধ আড্ডা, মাদক সেবন ও জুয়া খেলার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপ আলাদা নাম নিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী, বখাটে, মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও কোনো কোনো গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: রাস্তা খননের অন্তহীন ভোগান্তি: সমাধান কোথায়?
পুলিশের সাম্প্রতিক তিন দিনের বিশেষ অভিযানে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১৬০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১০ কিশোরকে অভিভাবকের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার পরিচালিত অভিযানেই ৬১ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে কোতোয়ালি থানা এলাকায় ১৮ জন, শাহপরাণ থানায় ১২ জন, বিমানবন্দর থানায় ১১ জন, দক্ষিণ সুরমায় আটজন, জালালাবাদ থানায় সাতজন এবং মোগলাবাজার থানায় পাঁচজন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া অভিযানকালে ২৫০ গ্রাম গাঁজা ও ২৬টি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এর দুদিন আগে পৃথক অভিযানে আরো ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, সিলেটে কমপক্ষে ১৫টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব অপরাধ চক্রের অধিকাংশ সদস্যের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হলেও নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের বয়স ২০ বছরের বেশি। ছোট গ্রুপে ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য থাকলেও বড় গ্যাংগুলোতে সদস্যসংখ্যা আরো বেশি। এদের দাপটে বিশেষ করে আম্বরখানা, চৌহাট্টা, উপশহর, টিলাগড়, মদিনা মার্কেট, তালতলা, দক্ষিণ সুরমা, ধোপাদীঘির পাড় ওয়াকওয়ে, মাছিমপুর, বড় বাজার, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, কাজিটুলা, কুমারপাড়া, শিবগঞ্জ, নয়া সড়ক, মিরাবাজার, ভাতালিয়া-লামাবাজার ও বিমানবন্দর সংলগ্ন বড়শালা এলাকা বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। তাদের দাপটে পুরো নগরীতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আরও পড়ুন: কাতারের উপকূলে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: হতাহতের শঙ্কা
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে হুমকি, চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং মারামারির মতো অপরাধে লিপ্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি কাজির বাজার সেতু এলাকায় ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনাকেও গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ফলে কিছু গ্যাংয়ের তৎপরতা কিছুটা কমলেও বর্তমানে নতুন করে তাদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যুবলীগ-ছাত্রলীগের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত গ্যাংগুলোর তৎপরতা কমে এলেও নতুন করে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ
এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাইফুল ইসলাম জানান, মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধী ও কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের ধারণা, বেকারত্ব, পরিবারের নজরদারির অভাব, অপরাধী চক্রের প্রভাবে ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কিশোররা এই অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বস্তির বখাটেদের নেতৃত্বে এসব গ্রুপ গঠিত হলেও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী বা অভিজাত পরিবারের সন্তানরাও এতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
সমাজসচেতন ব্যক্তিরা মনে করছেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। এর জন্য পরিবারের সচেতনতা, সন্তানদের নিয়মিত মনিটরিং, খেলাধুলা ও গঠনমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে, এসব গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেছেন। এসএমপি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

