বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক করপোরেট জগতে প্রথাগত চাকরির গণ্ডি পেরিয়ে ক্যারিয়ারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ‘প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল’ বা পিএমপি সার্টিফিকেশন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট (পিএমআই) কর্তৃক প্রদত্ত এই আন্তর্জাতিক সনদটি একজন পেশাজীবীর তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং ব্যবহারিক দক্ষতা—উভয়েরই অনন্য প্রমাণপত্র। এটি নিশ্চিত করে যে, একজন ব্যক্তি যেকোনো জটিল প্রকল্প সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনা, বাস্তবায়ন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সফলভাবে শেষ করার সক্ষমতা রাখেন। বর্তমানে আইটি খাত, টেলিকম, আবাসন, বৃহৎ অবকাঠামো এবং উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ প্রজেক্ট ম্যানেজারদের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক কোম্পানি, আইটি ফার্ম, ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন এবং উন্নয়ন সংস্থায় প্রজেক্ট ম্যানেজারের চাহিদা আকাশচুম্বী। আনন্দের বিষয় হলো, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বর্তমানে বাংলাদেশেও পিএমপি সার্টিফিকেটধারীদের জন্য তৈরি হয়েছে এক বিশাল চাকরির বাজার। পিএমপি সার্টিফিকেশন আসলে কী এবং এর নেপথ্য প্রক্রিয়া বা পরীক্ষাপদ্ধতি কেমন, সেটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। আইটি সেক্টর থেকে শুরু করে সাপ্লাই চেইন, ফিন্যান্স, মার্কেটিং, কনস্ট্রাকশন এবং এনজিও সেক্টর—সব জায়গাতেই প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্কিল সমানভাবে সমাদৃত। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশি প্রকৌশলী, গবেষক বা আইটি এক্সপার্টদের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সার্টিফিকেশন একটি শক্তিশালী রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।
আরও পড়ুন: দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০-এর দ্বারপ্রান্তে
বাংলাদেশেও এই সার্টিফিকেটের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতের দ্রুত বিকাশের কারণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সার্টিফায়েড প্রজেক্ট ম্যানেজারদের আকর্ষণীয় বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে। যারা নিজের পেশাগত অবস্থান বদলে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করতে চান, তাদের জন্য পিএমপি হতে পারে একটি কার্যকর চাবিকাঠি। পরীক্ষার পাঠ্যক্রম মূলত প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বডি অব নলেজ বা পিএমবিওকে গাইডের ওপর ভিত্তি করে সাজানো, যা প্রজেক্টের পাঁচটি মূল পর্যায়—সূচনা, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, তদারক ও নিয়ন্ত্রণ এবং সমাপ্তি—নিয়ে কাজ করে।
আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে বিএনপি নেতা মামলায় ছাত্রদল নেতাসহ গ্রেপ্তার দুই
এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে হয়। চার বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩৬ মাস বা তিন বছর মেয়াদী প্রজেক্ট পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। আবার উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ৬০ মাস বা পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। এর পাশাপাশি সব প্রার্থীর জন্যই পিএমআই অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের ওপর অন্তত ৩৫ ঘণ্টার ফরমাল ট্রেনিং বা কন্ট্যাক্ট আওয়ার সম্পন্ন করা জরুরি। আবেদনের যাচাই-বাছাই শেষে পিএমআইয়ের অনুমতি পেলে অনলাইনে প্রোক্টরড পদ্ধতিতে অথবা অনুমোদিত পিয়ারসন ভিইউই টেস্ট সেন্টারে পরীক্ষা দেওয়া যায়।
আরও পড়ুন: গেটাফেকে হারিয়ে লা লিগায় জয়ের ধারা ধরে রাখলো বার্সা
পরীক্ষাপদ্ধতির বিষয়ে বলতে গেলে, মোট ১৮০টি মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন করতে ২৪০ মিনিট বা প্রায় চার ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। পরীক্ষার মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রজেক্টের রিয়েল-জীবনভিত্তিক কেস স্টাডি ও দৃশ্যপটভিত্তিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করা। করপোরেট দুনিয়ায় প্রজেক্টের বাজেট নিয়ন্ত্রণ, রিসোর্স বা জনবল ব্যবস্থাপনা এবং ক্লায়েন্টের প্রত্যাশা পূরণে এই সনদের কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া ঝুঁকি মূল্যায়ন বা রিস্ক ম্যানেজমেন্টে দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অপচয় কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে সার্টিফায়েড পেশাজীবীরা সরাসরি অবদান রাখতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে বড় টিম লিড বা ডিরেক্টর পদে পদোন্নতি এবং গ্লোবাল রিমোট জবের ক্ষেত্রেও এই ডিগ্রিধারীরা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকেন।
পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পিএমআইয়ের সর্বশেষ পিএমবোক গাইড ও প্র্যাকটিস গাইডগুলো ভালোভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। যেহেতু বর্তমান পরীক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, তাই সঠিক গাইডলাইন নেওয়া জরুরি। বাজারে থাকা বিভিন্ন অথরাইজড ট্রেনিং পার্টনার বা প্রিপারেশন সেন্টার থেকে ৩৫ ঘণ্টার ম্যান্ডেটরি ট্রেনিং নেওয়া যেতে পারে। মক টেস্ট বা প্র্যাকটিস এক্সামে নিয়মিত অংশ নিলে দীর্ঘ চার ঘণ্টার পরীক্ষার টাইম ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সহজ হয়। প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশোনা, কনসেপ্ট ক্লিয়ার করা এবং গ্রুপ স্টাডির মাধ্যমে প্রস্তুতির মান উন্নত করা সম্ভব। এছাড়া অনলাইন আপডেট ও প্রস্তুতির জন্য www.youtube.com/@AmerAlipmp ইউটিউব চ্যানেলটি অনুসরণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে পিএমআই চ্যাপটারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে ফেসবুক ও লিংকডইন প্ল্যাটফর্মগুলোও বেশ সহায়ক হতে পারে। সঠিক কৌশল ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই ক্যারিয়ারের এই আন্তর্জাতিক মাইলফলক অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে যাঁরা এই কঠিন অথচ সম্ভাবনাময় পিএমপি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

