আজকের সর্বশেষ সবখবর

মশা নিধনে ৪৮ হাজার কমিটি কাগজে থাকলেও বাস্তবে অকার্যকর

DSF NEWS
DSF NEWS
October 22, 2026 3:20 am
Link Copied!

ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির মধ্যেই বেরিয়ে এসেছে মশা নিধনের সরকারি উদ্যোগের এক বড় অসংগতি। সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৫৫৯টি কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর অধিকাংশেরই কোনো অস্তিত্ব বা কার্যক্রম নেই। ২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’ অনুযায়ী এসব কমিটি গঠন করার কথা ছিল। বরিশাল বিভাগে তিন মাসে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ছয় গুণ। দেখা যাচ্ছে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটির সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫৫৯।

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম গত সোমবার দাবি করেছেন, জাতীয় কমিটি, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভার কমিটিগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। অন্য স্তরগুলোর কমিটিগুলোও সক্রিয় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বরত অনেক কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধিরাই এ ধরনের কমিটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন না।

সবচেয়ে নিচের স্তরের কমিটি হচ্ছে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি’, যার সভাপতি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার। দেশে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন রয়েছে, যার ভিত্তিতে ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রায় ৪১ হাজারেরও বেশি কমিটি থাকার কথা। এছাড়াও জেলা পর্যায়ে ৬৪টি, উপজেলা পর্যায়ে ৫০৩টি এবং প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ওয়ার্ডগুলোতে আরও কমিটি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। সেই হিসাবে ওয়ার্ড ৪১ হাজার ৩৯১টি (প্রতি ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড হিসাবে)। সিটি করপোরেশনগুলোতে ওয়ার্ড আছে ৬৬৮টি এবং পৌরসভাগুলোতে ওয়ার্ড আছে কমপক্ষে ৯৯০টি।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে গাড়ি কারখানা করবে টয়োটা তুশো

ডেঙ্গুর বর্তমান চিত্র উদ্বেগজনক। গতকাল মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আগের দিন মৃত্যু হয়েছিল ৯ জনের। এ বছর এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত) সারা দেশে ১ হাজার ৯৯৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৫৬। এছাড়া গতকাল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রতিদিন মৃত্যুর খবর দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯০২ জন।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ের ২৪ সদস্যের কমিটির কাজ হলো কার্যক্রমের তদারকি, সমন্বয় এবং নীতি নির্ধারণ। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, বড় বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও মাঠ পর্যায়ের এসব কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এই বিশাল কাঠামোটি কার্যকর না থাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিটি স্তরে কত সদস্যের কমিটি কবে, কাদের নিয়ে কমিটি গঠিত হবে, কমিটির কার্যপরিধি—এসব বিস্তারিত ওই নির্দেশিকায় লেখা আছে।

আরও পড়ুন: আবেগঘন বিদায়: বেনিনকে হারিয়ে জয় দিয়ে শেষ মেসির অধ্যায়

বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিদের তথ্যানুযায়ী, বেশিরভাগ এলাকায় এসব কমিটি হয় গঠিতই হয়নি, অথবা কাগজে থাকলেও কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয় না। যেমন, পাবনার বেড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেড়া পৌরসভার প্রশাসক রুনাল্ট চাকমা জানান, কমিটি গঠনের কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিনও জানিয়েছেন, তাদের পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের কোথাও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি নেই।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, আগে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি থাকলেও বর্তমানে তা অকার্যকর। একইভাবে সিলেট সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা এবং যশোরের কেশবপুরের ইউনিয়ন পর্যায়েও কোনো কার্যকর কমিটি নেই বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। সদস্যদের মধ্যে আছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আরও ৫ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে চলতি বছরের ১১ মার্চ ও ১২ মার্চ দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ দেখা গেলেও তা টেকসই কোনো রূপ পায়নি। কোনো কোনো এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে ফগার মেশিন কিনে মশা নিধনের চেষ্টা চললেও সমন্বিত কোনো প্রশাসনিক কাঠামো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু যখন প্রথমবারের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন থেকেই মশা নিধনে স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেবল ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক চিন্তা না করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি ছিল। অথচ বছরের পর বছর ধরে এসব কমিটি কেবল কাগজে-কলমে বন্দি থাকায় এডিস মশা এখন গ্রামগঞ্জেও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়সারা ভূমিকা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন জরুরিভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের কমিটিগুলোকে সচল করা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যু কমানো কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই সাইটে নিজস্ব নিউজ তৈরি করে প্রকাশ করে থাকি। এই সাইটের সংবাদ নিয়ে কোনো অভিযোগ, আপত্তি বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে info@dsfnews.com-এ জানান। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।