চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের রেশ না কাটতেই এবার চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার জন্যও বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ দৌড়ে বর্তমানে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে (আইবিএ) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত এই চিঠির তথ্য গত শুক্রবার রাতে প্রকাশ্যে আসে। সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হলেও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বড় টার্মিনাল।
মন্ত্রণালয়ের এই চিঠিতে পিপিপি পদ্ধতিতে সিসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং বে পোর্ট মাল্টিপারপাস টার্মিনাল বাস্তবায়নের বিষয়ে আরএসজিটিআইয়ের দেওয়া আগ্রহপত্রের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া সিসিটির অপারেটর হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সূত্র বলছে, শুধু সিসিটি নয়, বন্দরটির গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি পরিচালনার জন্যও আরএসজিটিআই আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা বন্দর কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের খবরে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং ২২ এপ্রিল সৌদি আরবের আরএসজিটিআই সিসিটি পরিচালনার জন্য পৃথক প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। এছাড়া স্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী এমজিএইচও আগ্রহপত্র পাঠিয়েছিল। তবে সরকারের তরফ থেকে আরএসজিটিআইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যারা ইতিমধ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে। এমন দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত শ্রমিক-কর্মচারীরা মেনে নেবেন না।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ হয়েছে সিসিটিতে, যেখানে এনসিটি থেকে ৪৪ শতাংশ, জিসিবি থেকে ৩৬ শতাংশ এবং পিসিটি থেকে ৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডল করা হয়েছে। আরএসজিটিআই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা দায়িত্ব পেলে শুধু সিসিটিতেই এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং টার্মিনালটি আধুনিকায়ন করবে। এদিকে গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি পরিচালনার জন্য ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম ফোন ধরেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্দরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। রবিবার থেকে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। চিঠিতে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট শর্ত বা মেয়াদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ নেই বলে জানান তিনি। চিঠিতে সিসিটি ব্যবস্থাপনার মেয়াদ, আর্থিক শর্ত বা বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। সাপ্তাহিক ছুটি শেষ হলে অর্থাৎ রোববার (আজ) থেকে এ বিষয়ে কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বন্দর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, পিসিটি ও লালদিয়া টার্মিনালের পর এনসিটির সঙ্গে এবার সিসিটিও বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও যোগ করেন, জিসিবিও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বন্দরের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের কোন দেশে শতভাগ বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়?
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বন্দরের প্রতিটি টার্মিনাল স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ একটি লুটেরা গোষ্ঠী নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে টার্মিনালগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করছে। সরকার এর আগেও লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসকে দিয়েছে, যা বন্দরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ হ্রাসের আরেকটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: দখল-সন্ত্রাস নিয়ে কঠোর অবস্থান: পদত্যাগ করলেন এমপি মিষ্টি
আরও পড়ুন: রূপপুরের জ্বালানি বহনকারী বিমানের অনুমতি নিয়ে ব্যাখ্যা দিল পাকিস্তান

