নড়াইল জেলা প্রতিনিধি: রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে কর্মচারীদের বদলি একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রশাসনের কার্যক্রমে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময় পরপর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল পরিবর্তনের বিধান রয়েছে। তবে নড়াইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (সাবেক তহশীলদার/নায়েব)সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের বদলি নিয়ে বৈষম্য, অনিয়ম ও অর্থলেনদেনের অভিযোগে প্রশাসনের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-১ শাখা থেকে চলতি বছরের ২১ জুন জারি করা ৩৯১ নম্বর পরিপত্রের ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজস্ব প্রশাসন ও সাধারণ প্রশাসনের কর্মচারীদের পদায়ন ও বদলির বিষয়ে যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, নড়াইলে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, লোহাগড়া উপজেলা ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাহিদুর রহমান। তিনি সাধারণ প্রশাসন থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন অফিস সহকারী বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নাজির পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মোহাম্মদ বাবুল শেখ বর্তমানে নড়াইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এসএ শাখায় অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
এছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত আরও কয়েকজন কর্মচারী বর্তমানে সাধারণ প্রশাসনের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত রয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন—জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে সার্টিফিকেট পেশকার জ্যোতি রায়, নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সার্টিফিকেট পেশকার শারমিন সুলতানা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেনারেল সার্টিফিকেট শাখায় কর্মরত ইয়াসমিন সুলতানা এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত সুমনা ইসলাম। এছাড়া ক্রেডিট চেকিং কাম সায়রাত সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মামুন বিশ্বাস বর্তমানে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বদলি ঘিরে নতুন প্রস্তুতি
অধিকতর অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি সপ্তাহে নড়াইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (সাবেক তহশীলদার/নায়েব), অফিস সহকারী, পিয়ন, প্রসেস সার্ভারসহ বিভিন্ন পদে বড় ধরনের বদলির প্রস্তুতি চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “বদলির মৌসুমে ডিসি অফিসের রাজস্ব শাখায় ঈদ লেগে যায়। কারও পকেট ভরে, আবার কারও পকেট শূন্য হয়। তবে উভয় পক্ষই লাভবান হয়।” তবে ওই কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা (জেএম) শাখায় আব্দুল্লাহ নামে একজন অফিস সহকারী প্রায় এক দশক ধরে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। একইভাবে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের গোপনীয় সহকারী হিসেবে জিয়াউল ইসলাম চার বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থল ও শাখায় দায়িত্ব পালনের পরও তাদের বদলি না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন কর্মচারী।
বদলির আতঙ্কে কর্মচারীরা
জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু অনেকের তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অন্যত্র বদলির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।
তাদের ভাষ্য, জেলা প্রশাসনের অধীন অন্য কোনো কর্মস্থলে বদলি হলে সাধারণত তারা অন্তত তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা ও পারিবারিক প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে পারেন। কিন্তু হঠাৎ বদলির আশঙ্কা তাদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে জেলা প্রশাসনের এক কর্মচারী বলেন, “জেলা প্রশাসক মহোদয় প্রয়োজন মনে করলে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেও কাউকে অন্যত্র বদলি করতে পারেন। কিন্তু সেই বদলিতে যদি বৈষম্য কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তাহলে তা প্রশাসনের দূরদর্শিতার পরিচয় নয়।”
আরেক কর্মচারীর ভাষ্য, “পেটের দায়ে ও পরিবারের কথা চিন্তা করে আমাদের মুখ বুজে কাজ করতে হচ্ছে। মাথার ওপর সবসময় বদলির আতঙ্ক থাকায় মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ এবং পারিবারিক জীবনেও পড়ছে।”
কর্মচারীদের অভিযোগ, বদলি নিয়ে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব ও সাধারণ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সুবিধাজনক বদলি বহালে অর্থলেনদেনের অভিযোগ-
এদিকে রাজস্ব প্রশাসনের বদলি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এসএ শাখার একজন কর্মচারীর মাধ্যমে সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বহাল রাখার জন্য অর্থলেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ বা নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বদলি প্রক্রিয়া ও অর্থলেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, “জেলা প্রশাসনের অধীন সকল কর্মচারীর বদলি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। জনস্বার্থে ও অফিস পরিচালনায় যে কোন শাখায় বদলি করা হয়ে থাকে। পরিপত্র অনুযায়ী নিয়োগকৃত রাজস্ব শাখায় স্বল্প লোকবল দিয়ে এতগুলো শাখা পরিচালনা করা কঠিন। কর্মকাল অনুসারে আমরা তালিকা করেছি, নিয়মানুযায়ী কর্মচারীদের বদলী করা হবে। আর ৩ বছরের অনুর্ধকালে কর্মরত কোনো কর্মচারী বিরুদ্ধে কোন ধরনের অসঙ্গতি ছাড়াই হঠাৎ বদলি করা যায় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক জানান, ‘জনস্বার্থে যে কোনো সময় যে কাউকে বদলি করা যায়। তবে বদলির ক্ষেত্রে শতভাগ নিয়ম মেনেই করা হবে।’
স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন বদলি প্রক্রিয়ার দাবি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের মতে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও প্রশাসনিক

