আকাশ সরকারঃ ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নারীদের বিনা পারিশ্রমিকের গৃহস্থালি ও পরিচর্যা শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে এই অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নশীলতার কাজের আর্থিক মূল্য ছিল ৬.৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৮.৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ কাজই করেছেন নারীরা। দেশের লাখো মায়ের কাছে এই পরিসংখ্যান নতুন কিছু নয়; এটি কেবল প্রমাণ করেছে যে দেশের অর্থনীতি নারীদের অদৃশ্য শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সেই শ্রমের কোনো পারিশ্রমিক নেই।
বাংলাদেশের অনেক নারীর জন্য মা হওয়া মানেই কর্মজীবনের সঙ্গে আপস করা। সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন হওয়া উচিত মা-বাবা উভয়ের যৌথ দায়িত্ব, কিন্তু বাস্তবে এর শারীরিক ও মানসিক চাপের বেশিরভাগই বহন করেন মা। আমাদের সমাজে মাতৃত্বকে নারীর “প্রকৃত দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়—তিনি তা চান বা না চান। ফলে সন্তান জন্মের পর আগের উদ্যম নিয়ে কর্মজীবনে ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে নিজের ক্যারিয়ারকেই গৌণ মনে হতে শুরু করে, কারণ সন্তানের যত্ন নেওয়াকে একমাত্র মায়ের কাজ হিসেবেই ধরা হয়।
ব্র্যাকের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের একটি কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে আবেদন করা ১,২০০ জন মধ্য-কর্মজীবী নারীর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই আগে চাকরি ছেড়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৮.৮ শতাংশ গৃহস্থালি দায়িত্বের কারণে এবং ৩৬ শতাংশ মাতৃত্বের কারণে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। এমনকি যারা চাকরি করেন, তাদেরও অফিসের কাজের পাশাপাশি বাড়ির অধিকাংশ কাজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তাদের ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হয়। বাস্তবে একজন পুরুষের বিশ্রামের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে তার আশপাশের নারীদের অবৈতনিক শ্রমের ওপর নির্ভর করে।
সমস্যাটিকে আরও গভীর করে তোলে নারীর আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করার সামাজিক সংস্কৃতি। মা, বোন বা স্ত্রী হিসেবে নারীর নিঃস্বার্থ ত্যাগকে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে শেখানো হলেও, তা অনেক সময় নীরব মানসিক চাপের রূপ নেয়। এই আত্মত্যাগের আদর্শ পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে, কারণ এতে বৈষম্যকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। এর মূল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয়ও। দেশে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলা হলেও, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ এখনো প্রায় ৪৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৮০ শতাংশ। এই ব্যবধানের অন্যতম প্রধান কারণ গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজের ভার। দক্ষ ও শিক্ষিত নারীরা যখন “ভালোবাসার দায়িত্ব” পালন করতে গিয়ে আয়ের কাজ ছেড়ে দেন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু তারা নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতিও। অথচ এই দায়িত্ব বাবা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া সম্ভব, কারণ এই শ্রমের সুফল সবাই ভোগ করেন।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে চিত্রটি আরও কঠিন। অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই উপার্জন করেন, কিন্তু ঘরের সব কাজের দায়িত্ব থেকে যায় নারীর কাঁধে। আর সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে অনেক সময় তাকে সহিংসতার শিকার হতে হয়। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিবিএসের “নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪” অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং গত এক বছরের মধ্যেই এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে ৪১ শতাংশ নারীর। অনেক পরিবারে নারীই প্রধান উপার্জনকারী, আবার বেকার বা মাদকাসক্ত স্বামীর দায়িত্বও তাকেই বহন করতে হয়।
এই বাস্তবতা শুধু নিম্নবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী অনেক নারী নিজেদের উপার্জনের ওপরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। সংসারের সব দায়িত্ব একাই সামলানো যেমন প্রত্যাশিত, তেমনি নীরবে নিজের আর্থিক স্বাধীনতা ছেড়ে দেওয়াও যেন সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতারও প্রমাণ রয়েছে পরিসংখ্যানে। একই জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ নারী নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হন, যেখানে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকেও সহিংসতার একটি রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এসব ঘটনা শুধু পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের অসম বণ্টন নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত বৈষম্যকেও প্রকাশ করে। অধিকাংশ নারীকে এই দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করার সুযোগই দেওয়া হয় না। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েরাও নিজেদের যোগ্যতার চেয়ে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই মূল্যায়িত হতে শেখে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ পরিবার এই অবদানের স্বীকৃতিও দেয় না। সারাজীবনের অদৃশ্য ও অবৈতনিক শ্রম, অপূর্ণ স্বপ্নের বেদনা—সব মিলিয়ে এটি এক অসহনীয় বোঝা। তাই কোনো নারী যখন নিজের মতামত প্রকাশ করেন বা কোনো আলোচনায় অংশ নেন, তখনও তাকে শুনতে হয়—”রান্নাঘরে যাও।” ব্যঙ্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নারীবিদ্বেষ।
তবে এই বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় নয়। পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগাভাগি করা সম্ভব। বাবাদের কার্যকর পিতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র ও নমনীয় কর্মঘণ্টার ব্যবস্থা করা এবং সরকারি নীতিতে অবৈতনিক পরিচর্যা শ্রমকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া—এসবই পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। সরকার এই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের কাজ শুরু করেছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ। পরিচর্যা কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়, যা নারীরা পরিবারের জন্য করে থাকেন; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো। আর এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো দেশকেই দিতে হয়।
লেখক:
আদিবা নওশীন মিথী
শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইন্টার্ন, অ্যাপ্লায়েড ডেমোক্রেসি ল্যাব (ADL), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: adibanoshin2002@gmail.com

