পরীক্ষা, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা কিংবা বড় কোনো প্রতিযোগিতার ঠিক আগের মুহূর্তে অনেকেরই হঠাৎ জ্বর আসার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময় জ্বরের তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অনেকে জ্বর নিয়েই পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারেন না। এই ধরনের অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সাইকোজেনিক ফিভার’ বা ‘স্ট্রেস-ইনডিউসড হাইপারথার্মিয়া’। এটি মূলত একটি সাইকোসোমাটিক সমস্যা, যেখানে সংক্রমণের উপস্থিতি ছাড়াই কেবল তীব্র আবেগ, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপের কারণে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: বাস্তবে মন্ত্রীর মর্যাদায় মিঠুন চক্রবর্তী
মানসিক চাপের এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে খেলোয়াড়দের মধ্যেও এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এছাড়া যারা জনসমক্ষে বড় কোনো দায়িত্ব পালন করেন কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন, তাদের শরীরও এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। সাধারণত চাপের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে শরীরের তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তবে বিষয়টি কেবল উত্তেজনার বিষয় নয়, এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট জৈবিক কারণ। যখন কেউ তীব্র মানসিক চাপে থাকেন, তখন শরীরের হাইপোথ্যালামাস এবং সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে শরীর একটি ‘স্ট্রেস রেসপন্স’-এর মধ্যে প্রবেশ করে।
আরও পড়ুন: সৌদির দুই বিমানবন্দরে হুথি হামলা: নারীসহ নিহত ৩
মানসিক চাপের কারণে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর প্রভাবে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, রক্তনালি সংকুচিত হয় এবং তাপ উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। এতে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। সংক্রমণের কারণে হওয়া জ্বরের সাথে এর মূল পার্থক্য হলো—এখানে স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া মূল ভূমিকা পালন করে। তবে কেবল তাপমাত্রা বাড়লেই সেটিকে সাইকোজেনিক ফিভার বলা যায় না; চিকিৎসক প্রথমে সংক্রমণসহ অন্যান্য শারীরিক কারণগুলো পরীক্ষা করে দেখেন। তরুণ নারীদের ক্ষেত্রে গবেষণায় এ ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া কিছুটা বেশি দেখা গেলেও এটি যেকোনো বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে।
সাইকোজেনিক ফিভারের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া, মুখমণ্ডল লাল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, অনিদ্রা, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং বমি বমি ভাব বা পেটে অস্বস্তি। সংক্রমণের সময় যেমন কাশি বা গলাব্যথা থাকে, এই ক্ষেত্রে সাধারণত সেসব উপসর্গ থাকে না। এর চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো মানসিক চাপের উৎস খুঁজে বের করা এবং তা কমানো। সিবিটি বা কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি, সাইকোথেরাপি কিংবা কাউন্সেলিং এক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মেডিটেশন, মাইন্ডফুলনেস, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যোগব্যায়াম এবং নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করা উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলাই ভালো। পরিবারের পক্ষ থেকেও শিশু ও তরুণদের ওপর চাপের উৎসগুলো কমিয়ে আনা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনো অ্যানজায়োলাইটিক বা অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ওষুধ সেবন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া বারবার জ্বরনাশক সেবনও ঠিক নয়। শারীরিক অস্বস্তি খুব বেশি হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শরীর ও মন যেহেতু একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত, তাই মানসিক চাপের শারীরিক প্রভাবকে অবহেলা না করে সঠিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রতিবেদনের তথ্যগুলো খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহীর পরামর্শ অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে।

