গ্রিসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অর্থ, উপহার এবং বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর অপসারণের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সোমবার বলেছিলেন যে তিনি গিলফয়েলকে বরখাস্তের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। পরবর্তীতে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সামনে তিনি জানান, গিলফয়েল দায়িত্ব পালনকালে ভালো কাজ করলেও সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদনগুলো অত্যন্ত হতাশাজনক এবং তা প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করেছে। হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারাইয়া এই বিদায়ে তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করলেও প্রশাসনিকভাবে তাকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা নিশ্চিত করেছেন। গিলফয়েল আরও লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার দায়িত্ব হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আমেরিকা ফার্স্ট আন্দোলন এবং আমার প্রিয় দেশের প্রতি আমার অঙ্গীকার কখনো শেষ হবে না।
আরও পড়ুন: ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত পোপ লিও, সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে গ্রিসের জ্বালানি খাতের এক লবিস্টের সঙ্গে গভীর সখ্যতা এবং তার পক্ষে প্রচারণা চালানোর ঘটনা। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্পের ছেলে এরিকের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে আমন্ত্রণ পাওয়ার লক্ষ্যে গ্রিসের ধনী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে সুবিধা আদায়ের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি এরিক ডিটার্স নামক এক মার্কিন ব্যবসায়ীর দাবি, গিলফয়েল তাকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে এক লাখ ডলারের ক্রেডিট কার্ড বিল পরিশোধের অনুরোধ করেছিলেন।
তবে গিলফয়েল এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে একে মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করেছেন। তিনি ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করে বলেছেন, নিজের নাম ও সম্মান রক্ষায় তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলও জানিয়েছে, এথেন্সে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগগুলো পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদারকি বিভাগ বর্তমানে খতিয়ে দেখছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আমার নাম, সুনাম ও সততা রক্ষায় আমি জোরালোভাবে লড়াই করব।’।
আরও পড়ুন: গাজ্জার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে অপরাধীদের বিচারের আহ্বান কাতারের আমিরের
দায়িত্ব পালনকালে গিলফয়েল নানা সময় আলোচনায় ছিলেন। বিশেষ করে গ্রিসে পৌঁছানোর পরপরই চীনের মালিকানাধীন পিরেয়ুস বন্দরের ৬৭ শতাংশ শেয়ার বিক্রির দাবি জানিয়ে তিনি কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেন। সেই সময় গ্রিসে চীনের রাষ্ট্রদূত ফাং চিউ যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে ‘সেকেলে মানসিকতা’ এবং ‘আধিপত্যবাদী মনোভাব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এসব প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, গ্রিস সরকারকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের দলের জন্য অসাধারণ সম্পদ ছিলেন। এ ছাড়া লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি সামুদ্রিক অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে গ্রিস।
আরও পড়ুন: সৌদি আরামকোর কমপ্লেক্সে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
গ্রিসের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই বহিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির প্রধান বিরোধী দল পাসোকের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র দিমিত্রিস মানৎসোস প্রশ্ন তুলেছেন যে, গিলফয়েলকে বরখাস্তের নেপথ্যের আসল কারণ কী এবং গ্রিস সরকার এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দাবি করবে কি না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, দেশটি হয়তো বাইরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর একটি নাট্যমঞ্চে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়।
ন্যাটো মিত্র গ্রিসে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির পক্ষে কাজ করছিলেন গিলফয়েল, যার মধ্যে এলএনজি আমদানি এবং এক্সনমবিলের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তি অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত সপ্তাহে এথেন্সে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সফরের সময় সন্ত্রাসবাদ দমনে তথ্য বিনিময়ের নতুন উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা এসেছিল। এমন কূটনৈতিক গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রদূতের পদত্যাগের বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে অতীতে গিলফয়েলের বাগ্দান হয়েছিল। পেশাগত জীবনে তিনি সান ফ্রান্সিসকোর প্রসিকিউটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে এই বিতর্কিত অধ্যায়ে গ্রিস সরকার বা দেশটির কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

