এম রাসেল সরকার;
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর থেকে ‘ইসলামিক আন্দোলন’-এর নেতা: খোলস পাল্টেও বন্ধ হয়নি সাইফুলের ফুটপাত বাণিজ্য। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকলেও রাজধানীর মতিঝিল এলাকার ফুটপাতগুলোতে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পুরোনো চাঁদাবাজ চক্র। বিগত সরকারের আমলে ‘বদজ্বীন’ নামে পরিচিত শীর্ষ ফুটপাত চাঁদাবাজ ও নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত সাইফুল মোল্লা নতুন পরিচয়ে ও ভিন্ন কায়দায় এই চাঁদাবাজির রামরাজত্ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দলীয় প্রভাব খাটানো এবং স্থানীয় এক বিএনপি নেতার প্রচ্ছন্ন আশ্রয়ে সাইফুল মোল্লা তাঁর পুরোনো ফ্যাসিস্ট সিন্ডিকেট নিয়ে মতিঝিল, গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় নতুন করে পার্কিং ও ফুটপাত বাণিজ্যের জাল বিছিয়েছেন। এতে করে সাধারণ হকারদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাইকোর্ট, গুলিস্তান, পুরানা পল্টন ও মতিঝিল এলাকার বহুল পরিচিত পেশাদার ফুটপাত চাঁদাবাজ সাইফুল মোল্লা বিগত ১৭ বছর ধরে মতিঝিলের ফুটপাতে একক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার প্রধান সহযোগী হিসেবে হকারদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সরকারের পতনের সাথে সাথে সাইফুল ও তাঁর সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।
তবে সম্প্রতি বিপুল অর্থের বিনিময়ে তিনি ‘ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর কদমতলী থানা সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন এবং আগামী নির্বাচনে পদপ্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দেন। এই নতুন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক খোলস ব্যবহার করে এবং স্থানীয় এক বিএনপি নেতার প্রশ্রয় নিয়ে তিনি তাঁর পুরোনো সন্ত্রাসী বাহিনীকে মাঠে নামিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিলের বিশাল এলাকার ফুটপাতগুলোতে প্রতিদিন খুচরা চাঁদা (৫০-১০০ টাকা) তোলার পাশাপাশি গজ বা ফুট হিসেবে জায়গা বরাদ্দ দিয়ে হকারদের কাছ থেকে এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাইফুলের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক মামলা হয়েছিল, কিন্তু বিগত প্রশাসনের ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতির কারণে তিনি সবসময়ই পার পেয়ে গেছেন। মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকার একজন দীর্ঘদিনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ভেবেছিলাম ৫ই আগস্টের পর শান্তিতে ব্যবসা করতে পারব, কোনো জুলুম থাকবে না।
কিন্তু এখন দেখছি শুধু মানুষের মুখ বদলেছে, অত্যাচারের নিয়ম বদলায়নি। সাইফুল মোল্লা ও তার লোকজন আবার পার্কিংয়ের নামে টাকা তোলা শুরু করেছে। আমরা পেটের দায়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ব্যবসা করি। আমাদের রক্তচোষা এই টাকা না দিলে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। প্রতিবাদ করলে মারধর ও উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
অন্য একজন হকার জানান, অতীতে সাইফুলের চাঁদাবাজির কারণে বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু উল্টো সাইফুলের পালিত গুন্ডাবাহিনীর তোপের মুখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এখন আবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজির এই নতুন প্রবণতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, ফুটপাত সাধারণ জনগণের চলাচলের অধিকার। এটি দখল বা লিজ দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার অপব্যবহার বা দল পরিবর্তনের মাধ্যমে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড জারি রাখছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটগুলোকে যদি এখনই দমন করা না যায়, তবে তা সরকারের সুশাসনের মূল স্পিরিটকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভুক্তভোগীদের উচিত ভয় না পেয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করা।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সাইফুল মোল্লার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ হকারদের দাবি, মতিঝিল ও পল্টন এলাকার ফুটপাতকে চাঁদাবাজমুক্ত করতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

