বিশেষ প্রতিবেদকঃ মানুষ জীবনে বহু প্রিয় জিনিস হারায়। কেউ হারায় স্বপ্ন, কেউ প্রিয়জন, কেউ বা জীবনের অবলম্বন। কিন্তু মা-বাবাকে হারানোর বেদনা এমন এক নীরব ধ্বংস, যার শব্দ বাইরে শোনা না গেলেও ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়ত মানুষকে ভেঙে দেয়। এই শূন্যতার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না; পৃথিবীর কোনো যন্ত্র দিয়েও এর পরিমাপ সম্ভব নয়। কারণ, বুকের ভেতরের এই নিঃশব্দ কান্না কেবল সেই মানুষটিই অনুভব করতে পারে— যার মাথার উপর থেকে মা-বাবার ছায়া সরে গেছে।
প্রায় দেড় যুগ আগে, ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর, ১৪ জিলহজ্জ শুক্রবার হারিয়েছিলাম আমার বাবাকে। সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই চলতি বছরের ২৩ মে, ৪ জিলহজ্জ শুক্রবার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন আমার শ্রদ্ধেয় মা। বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে আজ নিজেকে সত্যিই অসহায়, নিঃস্ব ও এতিম মনে হচ্ছে।
মায়ের মৃত্যুর পর থেকে ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি নীরবতা যেন কষ্টের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ঘরে একসময় মায়ের ডাকে সকাল হতো, আজ সেখানে শুধুই নিস্তব্ধতা। যে মানুষটি সব কষ্ট নিজের ভেতরে লুকিয়ে সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চাইতেন, সেই মানুষটিই আজ মাটির নিচে নিথর শায়িত।
মা জীবনের শেষ সময়ে আমাকে অনেক কথাই বলে গেছেন। কিছু উপদেশ, কিছু কষ্ট, কিছু না বলা অভিমান— সবকিছুই আজ বুকের ভেতরে বিষাদের মতো জমে আছে। সেই কথাগুলোর চূড়ান্ত ফয়সালা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক কেয়ামতের ময়দানে করবেন। কিন্তু দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে সেই শূন্যতা আর কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
চারপাশে মানুষ আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে, পরিচিত মুখ আছে— তবুও কেন জানি পৃথিবীটাকে এখন বড় অচেনা লাগে। সবাই সান্ত্বনা দেয়, বলে— “সময় সব ঠিক করে দেয়।” অথচ সময় কখনো মা হারানোর ব্যথা মুছে দিতে পারে না; বরং প্রতিটি দিন মানুষকে আরও বেশি উপলব্ধি করিয়ে দেয়— “মা” নামের আশ্রয়টি আর পৃথিবীতে নেই।
মানুষের সামনে হাসিমুখে কথা বলতে হয়, স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে হয়; কিন্তু গভীর রাতে নিঃশব্দে বুকের ভেতর জমে থাকে অজস্র কান্না। অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু বলার মতো সেই মানুষটি আর নেই। জীবনের প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহ বহু আগে থেকেই ছিল। সংসারজীবনের প্রতিও কখনো খুব বেশি আকর্ষণ অনুভব করিনি। কিন্তু মায়ের ইচ্ছাতেই সংসারের পথে হাঁটতে হয়েছিল। আজ সেই মাকেই হারিয়ে জীবনের অনেক কিছুই অর্থহীন ও তিক্ত মনে হয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো— পৃথিবীতে এমন কেউ আর রইলো না, যার কাছে নির্দ্বিধায় নিজের সব দুঃখ বলা যায়। বিপদে মাথায় হাত রেখে বলবে— “ভয় পাস না, আমি আছি।” মা চলে যাওয়ার পর মানুষ সত্যিকার অর্থেই বুঝতে পারে, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টি কত নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে।
তবুও একজন মুমিন হিসেবে বিশ্বাস রাখি, মহান আল্লাহ পাক তাঁর অসীম রহমতে একদিন আবার পরকালে প্রিয় মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেবেন। সেই আশাই আজ একমাত্র সান্ত্বনা, একমাত্র অবলম্বন।
পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে আকুল প্রার্থনা— তিনি যেন আমার মরহুম বাবা-মাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন, তাঁদের কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করে দেন এবং সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
আমিন।

