মোঃ মোহন আহমদ ‘
সাংবাদিক ও গীতিকার!
বাউল সমাজের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ঐতিহ্য সংকট ও উত্তরণের উপায়!!
বাউল দর্শন কেবল বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির একটি অঙ্গ নয়, বরং এটি ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত মানবজাতির ‘অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage of Humanity)। সাইাঁজি লালন শাহ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকদের হাতে লালিত এই মুক্তিকামী, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাহ্যিক আঘাতের চেয়ে বর্তমানে বাউল সমাজের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভাজন এবং একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমান সংকট ও বিবাদের মূল ক্ষেত্রসমূহ
ভাবাদর্শগত মতভেদ ও অহংকার: লালনশাহী, সুরেশ্বরী, দেওয়ানবাগী কিংবা অন্যান্য ধারা বা তরীকার অনুসারীরা নিজেদের মতামতকে একমাত্র ‘সত্য’ দাবি করে অন্য ধারাকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা দেখাচ্ছেন। সাধনার ভিন্নতাকে গ্রহণ করার উদারতা দিন দিন কমে আসছে।
বাউল বনাম ‘বাণিজ্যিক বাউল’:
প্রকৃত সাধক ও গান পরিবেশনকারী শিল্পীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধনা ও ত্যাগের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মঞ্চের জনপ্রিয়তা এবং অর্থ উপার্জনকে প্রাধান্য দেওয়ায় প্রকৃত সাধকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন।
প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি: বিভিন্ন বাউল সাধক বা ভক্তদের মধ্যে ব্যক্তিগত শত্রুতা ও মতভেদের জের ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সরাসরি অনুষ্ঠানে একে অপরের চরিত্রহনন এবং আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বাউল সমাজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ঐক্যের অভাবে সৃষ্ট প্রভাব
মৌলবাদী শক্তির সুযোগ সৃষ্টি:
বাউল সমাজ যখন নিজেরা বিভক্ত ও বিবাদে লিপ্ত, তখন ঐতিহ্যবিরোধী ও মৌলবাদী শক্তিগুলো খুব সহজেই বাউল সংস্কৃতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ পাচ্ছে।
আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব:
বাউলদের ওপর হামলা বা নির্যাতন হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের অভাব দেখা যায়, কারণ বাউলদের কোনো একক বা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিত্ব নেই।
তরুণ প্রজন্মের বিভ্রান্তি:
বাউল সমাজের অন্তর্দ্বন্দ দেখে তরুণ প্রজন্ম বাউল দর্শনের প্রকৃত চেতনা (যেমন: সাম্য, মানবতা, অহিংসা) থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সংকট উত্তরণে করণীয় ও সুপারিশ
কেন্দ্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়
সর্বজনগ্রাহ্য প্রবীণ সাধক ও বাউল গবেষকদের নিয়ে একটি “জাতীয় বাউল সমন্বয় পরিষদ” গঠন করা, যা বিবাদ নিষ্পত্তিতে কাজ করবে।
বাউল দর্শনের মূল চেতনায় প্রত্যাবর্তন
বাউল সাধনার মূল কথা হলো “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”। বিভেদ ভুলে অহিংসা ও মানবধর্মের মূল সুরটি নিজেদের জীবনে চর্চা করা।
সামাজিক মাধ্যমে শালীনতা রক্ষা
অনলাইনে বা প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার না করে ব্যক্তিগত মতপার্থক্য আলোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে
সমাধান করা।
একক ও ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি
লোকসংস্কৃতি ও বাউলদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় দল-মত-তরীকা নির্বিশেষে এক মঞ্চে আসার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
উপসংহার
বাউল গান ও দর্শন বিশ্বদরবারে
বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে।
কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও পারস্পরিক বিভেদ এই কালজয়ী ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
বাউল সমাজ যদি অনতিবিলম্বে নিজেদের মধ্যকার এই আত্মঘাতী সংঘাত বন্ধ না করে
এবং ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে
এই ঐতিহ্য কেবল বইয়ের পাতাতেই
সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। নিজ অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই আজ বাউল সমাজের মাঝে ঐক্য ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য।
আরও পড়ুন: দাকোপে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে এসএসএফের হেলিপ্যাড পরিদর্শন
আরও পড়ুন: নওগাঁর সাপাহারে বিভিন্ন দুর্গামন্দির পরিদর্শন করলেন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান

