মোঃ মোহন আহমদ সাংবাদিক ও গীতিকার! বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | সিলেট বিভাগঃ লোকসংস্কৃতি ও সাধক-বাউলদের চারণভূমি হিসেবে পরিচিত সিলেট অঞ্চল (সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার)। মরমি সাধক দেওয়ান হাসন রাজা, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ দত্ত, দূরবীন শাহ কিংবা পীর মজলুম শাহের স্মৃতিবিজড়িত এই ভূমিতে দীর্ঘদিন ধরে বাউল ও লোকসাধকদের মধ্যে নানা বৈচিত্র্যময় মতভেদ, সাংগঠনিক বিভাজন এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাহ্যিক সামাজিক-ধর্মীয় মানসিকতার দ্বন্দ্বে বাউল পরিবেশ স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে।
সিলেট বিভাগের চার জেলার বাউল সমাজে সৃষ্ট এই মতভেদ, বিবাদ ও সংকটের নেপথ্যে থাকা প্রধান কারণসমূহ নিচে বস্তুনিরপেক্ষ ও বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:
১. সাধনধারা ও তত্ত্বগত মতভেদ (তত্ত্বীয় দ্বন্দ্ব)
বাউল বনাম মারেফতি/সুফি ধারা: সিলেট অঞ্চলে বাউলদের মধ্যে প্রধানত দুই ধরনের ধারা লক্ষ্য করা যায়—একদল বিশুদ্ধ দেহতত্ত্ব ও লোকায়ত বাউল দর্শনে বিশ্বাসী, অন্যদল সুফি/মারেফতি ও চিশতিয়া-কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী। এই দুই ধারার গান ও গায়কি পদ্ধতির ভেতরে তত্ত্বগত মতপার্থক্য রয়েছে।
মূল ভাব বনাম আধুনিক রূপান্তর: প্রাচীন সাধক বাউলদের মূল সুর ও কথাকে বিকৃত করে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগ বা পরিবর্তন আনা নিয়ে প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আদর্শিক মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে।
২. বাণিজ্যিকীকরণ ও ‘অপসংস্কৃতি’ অনুপ্রবেশের বিতর্ক
চটুল গানের বিস্তার: বর্তমানে বাণিজ্যিক মেলা, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মূল বাউল বা সুফি গানের জায়গায় অনেক সময় চটুল কিংবা মানহীন গানের পরিবেশনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অসন্তুষ্টি ও বিভাজন: খাঁটি বাউল সাধকরা মনে করেন, বাণিজ্যিক মুনাফালোভী এক শ্রেণীর শিল্পী মূল বাউল দর্শনকে ক্ষুণ্ন করছেন। এতে সাধক সমাজ এবং পেশাদার পারফর্মার বাউলদের মধ্যে মানসিক ও দূরত্বমূলক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
৩. সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সুযোগ-সুবিধার ভাগাভাগি
শিল্পীদের আঞ্চলিক দল উপদল: চার জেলায় স্থানীয় বাউল সমিতি, মাজারভিত্তিক একাডেমি এবং সংস্কৃতিকর্মীদের নিজস্ব কিছু বলয় সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অনুদান, জাতীয় পর্যায়ে পারফর্ম করার সুযোগ এবং মাজারভিত্তিক ওরসের মঞ্চ বরাদ্দ নিয়েও জেলাভিত্তিক শিল্পীদের মধ্যে নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান।
সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা: সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বাউলদের এক ছাতার নিচে আনার মতো সর্বজনগ্রাহ্য অভিভাবকতুল্য নেতৃত্বের অভাব বাউল সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছে।
৪. সামাজিক-ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও বহিরাগত আক্রমণ
মাজার ও গানবন্ধের সামাজিক চাপ: সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে বিভিন্ন ওরস ও মাজারভিত্তিক বাউল গানের আসরে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার, গান পরিবেশন এবং সময়সীমা নিয়ে স্থানীয় এক শ্রেণীর ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠীর সাথে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
হামলা ও প্রতিবন্ধকতা: বিভিন্ন স্থানে গভীর রাতে গান বাদ্যের কারণে ঘুমের ব্যঘাত ঘটার অভিযোগ বা আকিদাগত পার্থক্যের কারণে গানের আসর ও মঞ্চ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে বাউল অঙ্গনে আতঙ্ক ও নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বাড়িয়ে তুলছে।
৫. মৌলিক স্বত্ব ও গীতিকারদের অবমূল্যায়ন
রয়্যালটি ও স্বীকৃতি সংকট: সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বহু মরমি সাধক ও বাউলদের লেখা গান সংগ্রহ ও পরিবেশন নিয়ে স্থানীয় গায়কদের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়। অনেক সময় মূল গীতিকারের নাম পরিবর্তন করে গান গাওয়া বা প্রচার করা কেন্দ্র করে চার জেলার লোকশিল্পীদের ভেতরে অসন্তোষ দেখা যায়।
উপসংহার ও উত্তরণের পথ
সিলেট বিভাগের ঐতিহ্যবাহী বাউল ধারা কেবল একটি গানের প্রথা নয়, এটি এই অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার পরিচয় বহন করে।
বাউলদের অভ্যন্তরীণ এই মতভেদ নিরসন এবং বহিরাগত চাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য—
১. চার জেলার বাউলদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিষদ গঠন করা।
২. দেহতত্ত্ব ও লোকায়ত দর্শনের সঠিক বার্তা বজায় রেখে গান পরিবেশনে শৃঙ্খলা আনা।
৩. স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের উদ্যোগে বাউল সাধকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঐতিহাসিক ওরস ও লোকউৎসবগুলোকে সুশৃঙ্খল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন: দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় জীবিকায় সংকট, নদী খোলার খবরে আশাবাদী শ্রমিক পরিবার
আরও পড়ুন: মাত্র ৯ ও ১১ বছর বয়সেই কুরআন হিফজ, উম্মুলক্বোরা মহিলা একাডেমিতে দুই শিক্ষার্থীর সংবর্ধনা

