সৌদি আরবের আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের রূপকার যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে বিনিয়োগ, পর্যটন ও বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্রে পরিণত করতে চান। তবে তার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন ইয়েমেন যুদ্ধের নতুন চাপে কোণঠাসা। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দক্ষিণ সীমান্তের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটেছে। কয়েক বছরের আপেক্ষিক শান্ত পরিবেশ ভেঙে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়মিত আঘাত হানছে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে, যার ফলে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন—যাদের মধ্যে সৌদি পাইলটও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের পরেও ধারাবাহিক কৌশলগত ভুলের কারণে সৌদি আরব এক নতুন ও জটিল সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, গত বছরের শেষের দিকে ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক সরঞ্জামের ওপর সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলা দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী মিত্রতায় ফাটল ধরিয়ে দেয়। এর ফলে ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব ঠেকাতে এক দশক ধরে চলা যৌথ প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা লাগে। সৌদি আরব তখন প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে বিরল প্রচার অভিযান শুরু করে এবং সুদান ও ইয়েমেনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য আমিরাতকে দায়ী করে। পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করে। একই সঙ্গে হুথিদের পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় চালু করে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। বিভিন্ন দিক থেকে হামলায় দেশটির তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে এবং বড় বড় প্রকল্প বাতিল হচ্ছে।
আরও পড়ুন: হলি ক্রস বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ২০২৭ সালে নবম শ্রেণিতে ভর্তি
ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সংকট আরও ঘনীভূত হয় যখন আমিরাত তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। আবু ধাবি চলে যাওয়ার পর যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়, তা রিয়াদ পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে আমিরাত-সমর্থিত যোদ্ধারা দাবি করেন। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমিরাত চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না, যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। সৌদি আরব আমিরাতের মতো কার্যকর নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি বলে মনে করা হচ্ছে। ইয়েমেনের স্থানীয় মিত্রদের সহায়তায় পরিচালিত এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেনস ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।
আরও পড়ুন: রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, আহত ২৪
আঞ্চলিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পায় যখন আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের আট সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি আমূল বদলে যায়। এমন প্রতিকূল সময়ে ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামাল দেওয়া সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, সৌদি আরবের সামরিক কাঠামো এককভাবে এমন দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালানোর মতো উপযুক্ত নয়। যে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে সৌদি আরব দূরে থাকতে চেয়েছিল, সেই সংঘাতেই আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে দেশটি।
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনির মতে, শত্রুপক্ষ থেকে হামলা আসার পর পাল্টা জবাব দেওয়া সৌদি আরবের জন্য প্রত্যাশিত ছিল। তবে হুথিদের আক্রমণের জন্য রিয়াদ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ইরান গত জুলাই মাসে একটি বাণিজ্যিক বিমানে করে হুথি প্রতিনিধিদের খামেনির জানাজায় নিয়ে গেলে আকাশপথে অবরোধ থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের নিরাপত্তা ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর জবাবে হুথিরা যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফেলে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে কৌশলগত এলাকা দখল করে নেয়। চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে ওঠে।
ইয়েমেনের এই অগ্রযাত্রা ২০২২ সালের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত সবচেয়ে বড় উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। হুথিরা এরপর সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও পাইপলাইনে হামলা চালিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করে, যার ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি বাহিনীও শত শত বিমান হামলা চালায়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কেবল বাইরের দেশের সহায়তা বা প্রাথমিক সাফল্য দিয়ে এই যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের নিরসন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকেও সৌদি আরবের একটি বড় ভুল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হামলার অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন ওমানের মাধ্যমে হুথিদের সঙ্গে আলোচনার পথ বেছে নেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে চূড়ান্ত সমর্থন না পাওয়ায় সৌদি আরব এখন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো অন্য দেশের সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফ্রান্স সামরিক সদস্য ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী মোতায়েনে সম্মত হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তই এখন রিয়াদের জন্য প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াবেন কি না, তা বুঝতে ভুল করেছে রিয়াদ।

