হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। প্রণালীটির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ৩৩-৩৯ কিলোমিটার (২১-২৪ মাইল) চওড়া। কিন্তু এই ছোট পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এবং প্রচুর এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পরিবহন হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালী হাজার হাজার বছর ধরে বাণিজ্য, সাম্রাজ্য ও যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল:
– প্রাচীনকাল (৫০০০+ বছর আগে): মেসোপটেমিয়া, পারস্য ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান পথ ছিল এটি। আচেমেনিড ও সাসানিয়ান পারস্য সাম্রাজ্য এই প্রণালীকে নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্যিক শক্তি বাড়িয়েছিল।
– মধ্যযুগ (১০ম-১৬শ শতাব্দী): “হরমুজ রাজ্য” (Kingdom of Hormuz) এখানে একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। মশলা, রেশম, মণি-মাণিক্য, মুক্তা ও অন্যান্য পণ্য এখান দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যাতায়াত করত। চীনা অ্যাডমিরাল ঝেং হে-এর নৌবহরও এই পথ ব্যবহার করেছিল।
– পর্তুগিজ যুগ (১৫১৫ সাল): পর্তুগিজরা হরমুজ দ্বীপ দখল করে প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে। তারা এটিকে “পূর্বের সোডোম ও গোমোরাহ” বলে অভিহিত করত কারণ এখানে অসাধারণ সমৃদ্ধি ও বিলাসিতা ছিল।
– অটোমান ও ব্রিটিশ যুগ: অটোমান সাম্রাজ্য ও পরে ব্রিটিশরা এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করেছে। ১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা এটিকে “পাইরেট কোস্ট” বলে নিয়ন্ত্রণ করত।
– আধুনিক যুগ (২০শ শতাব্দী থেকে): ১৯০৮ সালে ইরানে তেল আবিষ্কারের পর এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। ১৯৮০-এর দশকের “ট্যাঙ্কার ওয়ার” (ইরান-ইরাক যুদ্ধ) এবং ২০১৯-২০২০ সালের ইরান-মার্কিন উত্তেজনায় প্রণালী বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়।
বর্তমান গুরুত্ব
– বিশ্বের প্রায় ২০-২১% তেল (প্রতিদিন ২ কোটিরও বেশি ব্যারেল) এবং প্রচুর এলএনজি এই প্রণালী দিয়ে যায়।
– ইরান, সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের তেল রপ্তানির প্রধান পথ।
– যদি প্রণালী বন্ধ হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
হরমুজ প্রণালী শুধু তেলের পথ নয় — এটি সাম্রাজ্য, বাণিজ্য ও ক্ষমতার প্রতীক। হাজার বছর ধরে যে কেউ এটি নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে-ই বাণিজ্য ও রাজনৈতিক শক্তি লাভ করেছে।

