ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ (OPEC+ সদস্য)। তার তেল রপ্তানি নীতি মূলত অর্থনৈতিক বেঁচে থাকা, স্যাংশন এড়ানো এবং রাজনৈতিক চাপ প্রতিরোধ করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে (২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত) ইরানের তেল রপ্তানি নীতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
১. মূল লক্ষ্য
– রাজস্ব সংগ্রহ: তেল রপ্তানি থেকে আয় ইরানের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ। যুদ্ধ, স্যাংশন ও অভ্যন্তরীণ চাপ সত্ত্বেও ইরান প্রতিদিন ১.৫ থেকে ২.২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রায় ২.১৭ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন)।
– স্যাংশন এড়ানো: যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর স্যাংশনের কারণে ইরান আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি তেল বিক্রি করতে পারে না। তাই শ্যাডো ফ্লিট (অন্ধকার জাহাজবহর), জাহাজ-থেকে-জাহাজ তেল স্থানান্তর (ship-to-ship transfer), নাম পরিবর্তন (rebranding) এবং বার্টার (বিনিময়) পদ্ধতি ব্যবহার করে।
– চীন-কেন্দ্রিক রপ্তানি: ইরানের তেলের ৭৫-৯৫% চীন কিনে নেয়। চীনের ছোট রিফাইনারি (teapots) ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা।
২. বর্তমান রপ্তানি নীতির বৈশিষ্ট্য
– ছাড়পত্র (Waiver) ব্যবহার: ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা ইরানি তেল (প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল) বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। এটি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য করা হয়েছে।
– বার্টার ও নন-ডলার লেনদেন: ইরান তেলের বিনিময়ে খাদ্য, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি আমদানি করে। চীনা ইউয়ান, রুশ রুবল বা অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেন করে ডলার-স্যাংশন এড়ায়।
– হরমুজ প্রণালী নীতি: ইরান হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যুদ্ধের সময় এটি বন্ধ রেখে চাপ সৃষ্টি করে, আবার শান্তির সময় খুলে দেয়। বর্তমানে (২০২৬) প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ/নিয়ন্ত্রিত।
– উৎপাদন ও রপ্তানির লক্ষ্য: যুদ্ধ সত্ত্বেও ইরান প্রতিদিন ৩.২-৩.৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। রপ্তানি ১.৫-২.২ মিলিয়ন ব্যারেল/দিনের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে।
৩. প্রধান ক্রেতা দেশ
– চীন: ৮০-৯৫% (সবচেয়ে বড় ক্রেতা)
– অন্যান্য: মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা (সীমিত)।
৪. চ্যালেঞ্জসমূহ
– যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ডারি স্যাংশন (চীনসহ অন্য দেশের ওপরও শাস্তি)
– শ্যাডো ফ্লিট জাহাজের ঝুঁকি (বীমা, আইনি জটিলতা)
– যুদ্ধের কারণে উৎপাদন ও রপ্তানি কখনো কমে যায়
– তেলের দাম কমলে রাজস্ব কমে
ইরানের তেল রপ্তানি নীতি মূলত স্যাংশন–এভেশন ও চীন-নির্ভর। তারা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে না গিয়ে গোপন পথে, ছাড়পত্র ও বার্টারের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে। যুদ্ধ সত্ত্বেও ইরান এই নীতি দিয়ে তার অর্থনীতি ও যুদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

