চলতি বছরের (৫ জানুয়ারি) সোমবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মৌলভী চা বাগানের বাংলো টিলার ঢালে জাকির হোসেন (৫০) কে গলা কেটে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে হত্যার অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) বুধবার ভোরে তাদেরকে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানাধীন ছুফুয়া বাবুর্চি বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন, সদর উপজেলার মৌলভী চা বাগানের পাথরটিলা লাইনের লক্ষীনারায়ন রবিদাসের ছেলে আকাশ রবি দাশ (২০), একই উপজেলার নিতেশ্বর (মোকামবাজার, প্রেমনগর চা বাগান রোড) এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে স্বাধীন আহমেদ (২০)।
এ ঘটনায় ভিকটিম জাকির হোসেনের স্ত্রী আনজিলা বেগম বাদী হয়ে মৌলভীবাজার সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। (সদর থানার মামলা নং-৬, তারিখ-৬ জানুয়ারি, ২০২৬; ধারা- ৩০২/৩৪ পেনাল কোড।) নিহতের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ইব্রাহীমপুর গ্রামে। পেশায় তিনি দিনমজুর এবং সাইফুর রহমান স্টেডিয়াম সংলগ্ন লিয়াকত আলীর কলোনীতে ভাড়া থাকতেন।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকালে মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্দ বিল্লাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মামলার তদন্তে ভিকটিমের পরিবারের দেওয়া তথ্য, পুলিশের গোপন সোর্স এবং তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত আকাশ এবং স্বাধীন নামে দুই যুবককে শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে গত (৭ জানুয়ারি) বুধবার ভোরে তাদেরকে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানাধীন ছুফুয়া বাবুর্চি বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে গতকাল (৮ জানুয়ারি) বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেফতারকৃত দু,জনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আবারো অভিযান পরিচালনা করা হয়। ঘটনাস্থল এবং তার আশেপাশে তল্লাশী করে ঘটনাস্থল থেকে ৩০০ মিটার দুরে গ্রেফতারকৃত দুইজনের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা দা এবং আসামি স্বাধীনের রক্তমাখা হুডি জব্দ করা হয়।
পুলিশ সুপার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য তুলে ধরে বলেন, ভিকটিম জাকির বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে ইট, বালু ও মাটি তোলাসহ দিনমজুরের কাজ করতেন। অপরদিকে আসামি স্বাধীন গাড়ির বালু ও ইট তোলার কাজ করতেন এবং হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। কাজের সূত্র ধরে প্রায় এক বছর আগে জাকিরের সঙ্গে স্বাধীনের পরিচয় হয়। জাকির প্রায়ই চা বাগানে গিয়ে বাংলা মদ পান করতেন। বন্ধুত্বের কারণে স্বাধীন জাকিরকে সময় দিতেন এবং তার সঙ্গে চলাফেরা করতেন। পরিচয়ের প্রায় তিন মাস পর একদিন রাতে জাকির বাংলা মদ পান করে দেওরাছড়া চা বাগানে স্বাধীনকে নিয়ে যান। সেখানে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জাকির স্বাধীনের শরীরে হাত দেন এবং সমকামিতার প্রস্তাব দেন। প্রথমে স্বাধীন রাজি না হলেও পরে জাকির তাকে রাজি করান। এর প্রায় এক মাস পর তারা আবার দেওরাছড়া চা বাগানে গিয়ে সমকাতিায় সম্পর্কে জড়ায়। পরবর্তীতে দেওরাছড়া ও মৌলভী চা বাগানে তারা একাধিকবার সমকামিতায় মিলিত হয়। এই সম্পর্কের সূত্রে জাকির ও স্বাধীনের মধ্যে এক ধরনের আর্থিক লেনদেনও শুরু হয়। জাকির তার আয় করা টাকা বিকাশে রাখতেন এবং প্রায়ই স্বাধীনকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতেন। স্বাধীনের ধারণা ছিল জাকিরের বিকাশে ২০৩০ হাজার টাকা থাকে। এক পর্যায়ে স্বাধীন জাকিরের বিকাশ অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড জেনে নেয়। স্বাধীনের আরেক বন্ধু ছিল মৌলভী চা বাগানের বাসিন্দা আকাশ রবি দাশ। স্বাধীন জাকিরের সঙ্গে আকাশের পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তারা তিনজন বিভিন্ন সময় একসঙ্গে আড্ডা দিত। স্বাধীনের সঙ্গে জাকিরের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বাধীন আকাশকে জানায়। আকাশের টিকটক করার জন্য মোবাইল কেনার টাকা দরকার ছিল এবং স্বাধীনের কাছেও টাকা-পয়সা ছিল না। এ অবস্থায় আকাশ ও স্বাধীন পরিকল্পনা করে জাকিরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল, জাকিরকে মেরে তার কাছ থেকে পাওয়া নগদ টাকা ও বিকাশের টাকা নিয়ে তারা কুমিল্লা চলে যাবে। এর আগে স্বাধীন কুমিল্লায় কাজ করে এসেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীন জাকিরকে জানায় যে তারা শারীরিক সম্পর্কে আকাশকে যুক্ত করতে চায়। জাকির এতে রাজি হয়। ঘটনার আগের দিন ফোনে কথা বলে তারা তিনজন বাগানে মিলিত হওয়ার সময় ঠিক করে নেয়। নির্ধারিত দিন (৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে জাকির গিয়াসনগর বাজারে আসে। আকাশ ও স্বাধীন তাকে রিসিভ করে। বাজারে তারা তিনজন একসঙ্গে চা খায়। পরে আকাশ কিছু সময়ের জন্য বাড়ি যায়। এদিকে জাকির ও স্বাধীন বাগানে গিয়ে বাংলা মদ কিনে পান করে এবং পরে গিয়াসনগর চৌমুহনায় এসে আকাশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। প্রায় আধঘণ্টা পর আকাশ তার বাড়ি থেকে একটি দা জ্যাকেটের নিচে লুকিয়ে এনে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর আকাশ, জাকির ও স্বাধীন গিয়াসনগর হয়ে বাংলা টিলা হয়ে রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখানে জাকির কিছু কনডম কিনে নেয় এবং নিজে প্যান্ট খুলে আকাশ ও স্বাধীনকে কনডম দেয়। এ সময় আকাশ ও স্বাধীন সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে জাকির বিরক্ত হয়ে তর্ক শুরু করলে আকাশ জ্যাকেটের ভেতর লুকানো দা বের করে। তখন স্বাধীন দা দিয়ে জাকিরের পায়ে আঘাত করে। জাকির পায়ে হাত দিলে স্বাধীন হাতে আঘাত করে। পরে আকাশ দা নিয়ে জাকিরের মাথায় একাধিক আঘাত করলে জাকির মাটিতে পড়ে যায়। এরপর আকাশ ও স্বাধীন পালাক্রমে দা দিয়ে জাকিরের গলায় আঘাত করে, ফলে জাকির নিথর হয়ে যায়। এরপর আকাশ দা বাগানেই ফেলে দেয় এবং স্বাধীনের রক্তমাখা জ্যাকেট বাগানের নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। জাকিরের পকেট থেকে ১৫০ টাকা নগদ ও একটি বাটন মোবাইল ফোন নিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হেঁটে বিসিকের কাছে যায়। সেখান থেকে সিএনজি করে তারা মৌলভীবাজার চৌমুহনায় পৌঁছে। চৌমুহনায় কাপড়ের দোকান বন্ধ থাকায় তারা বাজার টার্নিংয়ে যায়। জাকিরের বিকাশে থাকা ২,৫০০ টাকা থেকে তালুকদার বিপণী থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে একটি হুডি কেনে এবং বাকি ২,০০০ টাকা ক্যাশ আউট করে। এরপর বাজার টার্নিংয়ের কিসমত হোটেলে খেয়ে দুজন সিএনজি করে যার যার বাড়িতে চলে যায়। পরদিন ৪ জানুয়ারী সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে তারা আবার গিয়াসনগর বাজারে এসে শ্রীমঙ্গল যায় এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে দুজন কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা দা, আসামি স্বাধীনের রক্তমাখা হুডি, নগদ ৭৬০ টাকা , ভিকটিমের বিকাশ থেকে ক্যাশ আউট করা উদ্ধার করা হয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ (ক্রাইম এন্ড অপস) নোবেল চাকমা, সদর সার্কেল আবুল খয়ের, সদর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম ও ডিবির ওসি সুদীপ্ত ভট্টাচার্য।

